Latest News
জন্মদিনে গ্রন্থোৎসবে কথাসাহিত্যিক মঞ্জু সরকার – ‘নিজেকে ব্যর্থ লেখক মনে হয়’
সিঙ্গেল মাদার বইয়ের পাঠ উন্মোচন
অনুপ্রাণন প্রকাশন রাজশাহী বিক্রয় ও বিপণন শাখা উদ্বোধন
অনুপ্রাণন প্রকাশন এর চট্টগ্রাম শাখা উদ্বোধন
অনুপ্রাণন সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার (৪র্থ পর্ব) মোড়ক উন্মোচন
অনুপ্রাণন লেখক সম্মেলন ২০২৫- দ্বিতীয় পর্ব অনুষ্ঠিত
অনুপ্রাণনের ‘সাম্প্রতিক বাংলাদেশের কবি ও কবিতা সংখ্যা’র মোড়ক উন্মোচন
অনুপ্রাণন লেখক সম্মেলন ২০২৫ অনুষ্ঠিত- পাণ্ডুলিপি প্রতিযোগিতা বিজয়ীদের পুরস্কার বিতরণের জমকালো আয়োজন
কবি রফিক আজাদ স্মৃতি পুরস্কার পেলেন বাংলার দুই কবি – কবি ফারুক মাহমুদ ও কবি ফেরদৌস নাহার।
অনুপ্রাণন লেখক সম্মেলন – ২০২২
নতুন প্রকাশিত বইসমূহ
অনুপ্রাণন পঞ্চদশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা – বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য, চলচ্চিত্রে যুদ্ধ ও সংঘাত (দ্বিতীয় পর্ব)
অনুপ্রাণন পঞ্চদশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা- বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য, চলচ্চিত্রে যুদ্ধ ও সংঘাত (দ্বিতীয় পর্ব) – সম্পাদকীয়-
মধ্যযুগের বাংলা গীতিকবিতা, পদ্য, সুর ও সঙ্গীত সাধারণ বাঙালিকে তার ভাষা, সংস্কৃতি ও মানবতাবাদী মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শিখিয়েছিল। বস্তুত বিকশিত এই সাংস্কৃতিক ভিতের ওপর দাঁড়িয়েই বিংশ শতাব্দীতে আধুনিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক বিকাশ ঘটেছিল। যদিও আধুনিক অর্থে ‘জাতীয়তাবাদ’ ধারণার জন্ম তখনো হয়নি, তবে সঙ্গীতই প্রথম বাঙালিকে একটি অভিন্ন ভাষিক, সাংস্কৃতিক এবং ভৌগোলিক পরিচয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে শিখিয়েছিল। মধ্যযুগের ঠিক প্রাক্কালে রচিত চর্যাপদ মূলত বৌদ্ধ সহজিয়াদের সাধন সঙ্গীত। এটিই প্রথম প্রমাণ করে যে, বাংলা ভাষা উচ্চমার্গের আধ্যাত্মিক ও শৈল্পিক ভাব প্রকাশের উপযুক্ত। চর্যাপদের গীতিগুলোতে তৎকালীন বাংলার নদী, নৌকা, শবর-শবরীদের জীবনযাত্রা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ ফুটে উঠেছে, যা বাঙালির নিজস্ব ভৌগোলিক সত্তাকে প্রথম আকার দেয়। চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি ও জ্ঞানদাসের বৈষ্ণব পদাবলী জাত-পাত এবং ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে ওঠার গান গেয়েছে। চণ্ডীদাসের অমর বাণী—”সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই”—বাঙালিকে প্রথম চরম মানবতাবাদের পাঠ দেয়। শ্রী চৈতন্যদেবের সংকীর্তন আন্দোলন সঙ্গীতকে প্রাসাদের চার দেয়াল থেকে বের করে সাধারণ মানুষের মাঝে নিয়ে আসে। এই সাম্যবাদী চেতনা পরবর্তী সময়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রধান ভিত্তি (ধর্মনিরপেক্ষতা) হয়ে দাঁড়ায়। মনসামঙ্গল বা চণ্ডীমঙ্গলের গানগুলোতে আর্য দেবতাদের পরিবর্তে বাংলার নিজস্ব লৌকিক দেব-দেবীর আরাধনা করা হতো। এই সঙ্গীতগুলোতে কোনো স্বর্গীয় দেবরাজ্যের কথা ছিল না, বরং ছিল বাংলার সাধারণ মানুষের দারিদ্র্য, ঝড়-ঝঞ্ঝা এবং বেঁচে থাকার লড়াইয়ের গল্প। এটি বাঙালির নিজস্ব স্বাজাত্যবোধ ও আত্মপরিচয়কে তীব্র করে তোলে। নাথ গীতি, ময়নামতীর গান এবং পরবর্তী সময়ে লালন শাহ ও অন্যান্য বাউলদের গান ছিল সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মবিরোধী। এই সঙ্গীতধারা হিন্দু ও মুসলিম—উভয় সম্প্রদায়ের মানুষকে এক সুতোয় বেঁধেছিল। বাঙালি যে ধর্মের চেয়েও বড় একটি সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, এই বোধ বাউল ও সুফি সঙ্গীতের মাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি সুসংহত হয়। নদীমাতৃক বাংলার মাঝিদের ভাটিয়ালি গান বা উত্তরবঙ্গের ভাওয়াইয়া গান ছিল একান্তই মাটির গান। এই সুরগুলো কোনো কৃত্রিম রাজকীয় প্রভাবে তৈরি হয়নি। এগুলো বাঙালির অবচেতন মনে একটি অভিন্ন “সাংস্কৃতিক স্বদেশ” গড়ে তুলেছিল। মধ্যযুগের সঙ্গীত বাঙালিকে তার ভাষা, সংস্কৃতি ও মানবতাবাদী মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শিখিয়েছিল। এই সাংস্কৃতিক ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে বিংশ শতাব্দীতে আধুনিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক বিকাশ ঘটেছিল।
মধ্য ও আধুনিক যূগে বাঙ্গালীর জাতীয়তাবাদী সংগ্রামী চেতনা গঠনে গীত-কবিতা চর্চা ও সঙ্গীত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মধ্যযুগের সাহিত্য মূলত ছিল দেব-দেবী বা ধর্মকেন্দ্রিক (যেমন: মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলী)। তবে এই যুগেই প্রথম বাঙালি নিজের ভাষা ও ভূখণ্ডের প্রতি মমত্ববোধ প্রকাশ করতে শুরু করে, যা ছিল জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক ভিত্তি। সপ্তদশ শতকে যখন বাংলা ভাষাকে অবজ্ঞা করা হতো, তখন কবি আব্দুল হাকিম তাঁর ‘বঙ্গবাণী’ কবিতায় তীব্র ক্ষোভের সাথে লিখেছিলেন: “যে সব বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী / সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।”
নিজের ভাষা ও দেশের প্রতি এই চরম আনুগত্যই পরবর্তীকালে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রধান স্তম্ভ (ভাষাকেন্দ্রীক জাতীয়তাবাদ) হয়ে ওঠে। ইংরেজি শিক্ষার বিস্তার এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের শৃঙ্খল ভাঙার প্রয়াসে আধুনিক যুগে তীব্র স্বদেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদী কবিতার জন্ম হয়। রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘পদ্মিনী উপাখ্যান’-এ পরাধীনতার বিরুদ্ধে প্রথম জোরালো সুর তোলেন: “স্বাধীনতা-হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, / কে বাঁচিতে চায়? / দাসত্ব-শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে, / কে পরিবে পায়?” মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর সনেট এবং মেঘনাদবধ কাব্যের মাধ্যমে বাঙালির ভেতর আত্মমর্যাদাবোধ ও বীরত্বের চেতনা জাগিয়ে তোলেন। তাঁর ‘কপোতাক্ষ নদ’ সনেটে বিদেশের মাটিতে বসেও স্বদেশের প্রতি যে আকুলতা প্রকাশ পেয়েছে, তা বাঙালিকে নিজের মাটির প্রতি টান অনুভব করতে শিখিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর অসংখ্য কবিতা ও গীতিকবিতার (গান) মাধ্যমে বাঙালির মনস্তাত্ত্বিক জাতীয়তাবাদ গড়ে তোলেন। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় তাঁর রচিত গীতকবিতাগুলো রাস্তায় রাস্তায় গেয়ে বাঙালিরা বিভাজনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। তাঁর রচিত ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি বাঙালির জাতীয় ঐক্য ও আবেগের চিরন্তন প্রতীক হয়ে ওঠে। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘বিদ্রোহী’, ‘ভাঙার গান’ ও ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’-এর মতো কবিতা ও গানের মাধ্যমে বাঙালিকে সরাসরি সশস্ত্র ও রাজনৈতিক আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার অনুপ্রেরণা দেন। তিনি ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে একটি অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি স্থাপন করেন।ষাটের দশকে পাকিস্তানি নিপীড়নের বিরুদ্ধে শামসুর রাহমান তাঁর ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা’ বা ‘আসাদের শার্ট’ কবিতার মাধ্যমে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করেন। আল মাহমুদ, সুকান্ত ভট্টাচার্য (রবীন্দ্রোত্তর পর্বে), এবং নির্মলেন্দু গুণ-এর কবিতা বাঙালিকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তোলে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে গোবিন্দ হালদারের ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’ বা ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’—এই গীতকবিতাগুলো রণক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের ও অবরুদ্ধ দেশবাসীকে মানসিকভাবে বাঁচিয়ে রেখেছিল এবং চূড়ান্ত বিজয়ের পথে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। মধ্যযুগের কবিতায় বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে সুপ্ত আত্মপরিচয় শুরু হয়েছিল, আধুনিক যুগে এসে তা তীব্র ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী এবং পরবর্তীতে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র (বাংলাদেশ) গঠনের প্রধান সাংস্কৃতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়।
Quarterly Anupranan Year- 15 Issue- 3 : War and Conflict in Art, Leterature and Movies of Bangladesh (2nd part)
কবিতার গৃহস্থালি – ডালিয়া চৌধুরী
সবুজ গালিচায় বসে আছে দুজন
দু-দিকে মুখ করে
মধ্যিখানে গাঢ় সবুজ রয়ে যায় স্পর্শহীন,
বুকের ভেতর উথাল-পাথাল ঢেউ
রাজ্যের বিষণ্নতা।
দুজনের পথে ছড়িয়ে আছে ফণীমনসার কাঁটা
রোদ শাদা কপোতের সতর্কবাণী
ধ্রুব নক্ষত্র ঝরা রাতের অনিদ্র গতিরেখা।
ঘাসবনে শালিক জোড়ার কথোপকথনে
প্রজাপতি প্রদক্ষিণ করে সবুজ বেষ্টনী,
বাতাসে ভেসে আসা প্রণয় প্রতিস্বরে
দুজনে নদী অববাহিকায় ভেসে যেতে উদগ্রীব,
স্বপ্ন স্রোতের অনুকূলে, অথচ
প্রতিকূল স্রোত থেকে দীর্ঘশ্বাস নেয়।
শীতল দাঁড় টানা নাবিকের মতো
পাড়ি দিতে থাকে কুয়াশার উপকূল।
দুজন শুনতে থাকে মেঘের সংগীত,
তীব্র বর্ণিল বর্ষণে ভেসে যাওয়ার অপেক্ষায়
নোঙর ফেলে মহাকালের সমুদ্রে।
Kobitar Grihosthali
জলসন্ধি – সানজিদা সিদ্দিকা
ফুল হতে ফলে পরিণত হওয়ার জন্য প্রয়োজন পরাগায়নের। তাতে সাহায্য করে পাখি, বাতাস, ভ্রমর, প্রজাপতি প্রভৃতি। তেমনি কবির অন্তর্নিহিত ভাবকে ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করে কবিতা। আবার কবির ভাবকে নিজের ভাবের সাথে মিলিয়ে পাঠ করেন পাঠক। অতএব, বইয়ের অন্দরের কবিতা পড়ে পাঠক অন্তরে যা অনুভব করবেন তা-ই হলো জলসন্ধি-র নির্যাস। সেই নির্যাস আস্বাদন করতে কবির আহ্বান—পড়ুন পাঠক, কবির নামে।
Jolsondhi - Sanjida Siddiqua
অবসরভাতা ও বিবিধ দায়ভার – মাহবুব আলী
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত শিক্ষকদের জন্য অবসরকালীন সময়ে নিয়মিত মাসিক পেনশন পদ্ধতি নেই। শিক্ষকগণ সরকারি অনুদান বা তাঁদের বেতন থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অঙ্কের সঞ্চয় করেন, সেই সঞ্চয়ে সরকারের অংশ রয়েছে। চাকরি শেষে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকগণ সেই অর্থ এককালীন পেয়ে থাকেন; তার একটি কল্যাণ ট্রাস্ট তহবিল ও অন্যটি অবসরভাতা। এই অর্থ শিক্ষকের হাতে পৌঁছাতে-পৌঁছাতে তিন-সাড়ে তিন কিংবা চার বছর লেগে যায়। এই সময়টুকু অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের জন্য তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষার। কোনো কোনো শিক্ষক এই সময়ের বিন্দু বিন্দু মুহূর্ত গুনতে গুনতে পরপারে চলে যান। এমনই কষ্টকর অপেক্ষা, বেঁচে থাকার ক্লেশ ও অপমানের কাহিনি নিয়ে ‘অবসরভাতা ও বিবিধ দায়ভার’। একইসঙ্গে যোগ হয়েছে মানুষের জীবনযাপনের আকুলতা-স্বপ্ন-স্বপ্নভঙ্গ-বাস্তব-পরাবাস্তব-বঞ্চনা ও মানবিকতার পরিসরে চেনা-অচেনা অন্য কয়েকটি কাহিনি। সেই সকল কাহিনি বা গল্পের তেপান্তরে হারিয়ে যেতে স্বাগতম।
Oboshorvata O Bibidho Dayvar - Mahbub Ali
সমুদ্রলতা ও অন্যান্য গল্প – রুখসানা কাজল
নব্বই দশক থেকে রুখসানার লেখালিখির শুরু। খুব কম লিখেই বিদগ্ধ পাঠকদের কাছে তিনি কিছু প্রত্যাশা সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছেন। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে এ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে তাঁর বেশ কয়েকটি বই। অনুবাদ করেছেন, আফগানিস্তানের নারী লেখকদের লেখা নিয়ে একটি গল্পগ্রন্থ। রুখসানার সাহিত্যকর্মের মৌলিক প্রবণতা হল তাঁর চেনাজানা জগতকে চারমাত্রা থেকে( ফোর ডাইমেনশন) দেখে একটি পরোক্ষ প্রতিবাদ ছুঁড়ে দেওয়া। ঘটনা বর্ণনা করে গভীর তল্লাসি চালিয়ে যেন তিনি খুঁজে আনেন চরিত্রগুলোর বিভিন্ন আবর্তন। এই সংকলনে অন্তর্ভুক্ত গল্পগুলোর ক্ষেত্রেও তাঁর সেই স্বতন্ত্র শিল্পধারা কোনো ব্যতিক্রম ঘটেনি। গল্পগুলোতে রয়েছে বিচিত্র পটভূমি ও বহুবিধ অভিজ্ঞতা। রুখসানার গল্পের চরিত্ররা গ্রাম, মফস্বলি শহর ব্যস্ত মহানগরের গন্ডি ছাড়িয়ে আমেরিকা প্রবাসী আবার কখনও মরুভূমির কোনো যাযাবর গোষ্ঠীর জীবনযাপন করে। ‘জোহেবা’ গল্পটি মাতৃত্বের গৌরব ও আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধানে একরোখা। ‘বিষমপদী’ গল্পে অন্তরার আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে রবীন্দ্রনাথের স্ত্রীর নিঃসঙ্গতার প্রতিধ্বনি শোনা যায়। আবার ‘কেভ’ গল্পে বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশের পরিসরে থেকেও একজন স্বনির্ভর বাঙালী তরুণীর ধর্মের দড়ি ছিঁড়ে বেরুতে না পারার যন্ত্রণার পাশে খাদিজা গল্পের খাদিজার দ্বিধাহীন সিদ্ধান্ত গ্রহনের সক্ষমতা চোখে পড়ে। রুখসানার গল্পের ধনী গরীব নারীচরিত্রগুলো কেউই মূক নয়। সাদা চোখে রুখসানার নারীদের সামান্য মনে হলেও অসামান্যা নারী চরিত্র এঁকেছেন। সব মিলিয়ে এ ধরণের গল্প পাঠককে চেনাঅচেনা নারীদের নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে। গল্পগুলো পড়ার পর পাঠকের হয়ত আরও একবার খুঁজে দেখতে মন চাইবে, কোথায় কোন গল্পের কোন পৃষ্ঠায় রুখসানা লিখেছেন, ‘বেঁচে থাকার লড়াইয়ে কে কবে হারাতে পেরেছে নারীদের?
Samudralata O Anyanyo Golpo - Rukhsana Kazol
এই ঋণ শোধ হবে না – জোনাকী দত্ত
১৯৫২ থেকে ১৯৭১ আমরা বাঙালিরা চরম চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে পেয়েছি লাল-সবুজ পতাকা। বিশ্বমানচিত্রে বাংলাদেশ নামক দেশটি স্থান করে নিয়েছে সগৌরবে। যাঁদের নিঃস্বার্থ অবদানের জন্য আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি তাঁদের ঋণ কখনো শোধ হবার নয়। তাঁদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। আমার এই বইটি লেখার মূল উদ্দেশ্য হলো গল্পের মাধ্যমে সেই মহান ব্যক্তিদের ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার ঘটনা, ভাষা আন্দোলন, গণ আন্দোলন, পঁচিশে মার্চ, তাদের জন্য নির্মিত শহিদ মিনার, স্মৃতিসৌধ আরো নানান ঘটনা পাঠকের কাছে তুলে ধরা। আশা করছি ছোটো-বড়ো সকল পাঠকের গল্পগুলো ভালো লাগবে।
Ei Reen Shodh Hobe Na - Jonaki Dutta
মুক্তির মিছিল দেখবে বলে – আবু রেজা
‘মুক্তির মিছিল দেখবে বলে’ একটি ট্রিলজির সূচনাখণ্ড। দশটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত এই উপন্যাসে লেখক আবু রেজা মহান মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর সময়কে এক অনন্য কাঠমোয় রূপায়িত করেছেন। একটি পরিবারের শীর্ষকর্তা থেকে সর্বকনিষ্ঠ সদস্য পর্যন্ত সবার আনন্দ-বেদনা, উদ্বাস্তু জীবন, অনিশ্চয়তা ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে এক উত্তাল সময়ের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। এ আখ্যানের চরিত্রগুলোর যুদ্ধদিনের অভিজ্ঞতা পরিবারের ইতিহাস অতিক্রম করে স্বাধীনতাকামী জাতির আত্মত্যাগ, বেদনা ও মুক্তির অভিযাত্রার দলিলে পরিণত হয়েছে।
গ্রন্থটিতে স্থান পেয়েছে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের অভিঘাত, মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর নানান ঘটনা এবং বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের আবেগঘন মুহূর্ত। শিশুমনের বিস্ময়, ভয়, কৌতূহল ও স্বপ্নের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মিশে গেছে যুদ্ধদিনের নির্মম বাস্তবতা। এ আখ্যানের চরিত্রগুলোর প্রত্যক্ষ করা রক্তাক্ত দিনের স্মৃতি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে অতিক্রম করে জাতীয় স্মৃতির অংশ হয়ে উঠেছে।
এ উপন্যাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য গ্রাম ও শহরের জীবনবাস্তবতার সমান্তরাল উপস্থাপন। যুদ্ধের প্রতিঘাতে উদ্বাস্তু হয়ে ছুটে বেড়ানো একটি পরিবারের জীবন, মৃত্যুভয়, জীবনসংকট, আপনজনের নিরাপত্তাহীনতা এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শঙ্কা সংযত অথচ হৃদয়স্পর্শী ভাষায় বর্ণিত হয়েছে। একই সঙ্গে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতা, তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকারদের দেশবিরোধী কর্মকাণ্ড যেমন উঠে এসেছে, বিপরীতে সেই অন্ধকার সময়ে মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া আত্মীয়স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের ভূমিকাও গভীর মমতায় বিধৃত হয়েছে।
মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনার প্রতি লেখকের অবস্থান সুদৃঢ়, স্পষ্ট ও আপসহীন। তাঁর কাছে মুক্তিযুদ্ধ কেবল ইতিহাস নয়, জীবনবোধের ভিত্তি। তাই গ্রন্থের শেষে লেখক একটি প্রশ্ন রেখেছেন, যা পাঠককে ভাবিয়ে তুলবে—‘একাত্তরের যুদ্ধে শহীদ হয়েছে ত্রিশ লক্ষ প্রাণ। আবার এই বছরে জন্মেছেও পঁয়ত্রিশ লক্ষের বেশি শিশু। মহৎপ্রাণের বিনিময়ে শিশুপ্রাণ। এই শিশুরা বড়ো হয়ে পারবে কি পূর্বপুরুষের মহত্ত্বের মূল্য দিতে?’ নিশ্চয়ই বর্তমান সময়ই এর উৎকৃষ্ট উত্তর।
মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার, ইতিহাসচেতনা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দায়বোধ নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে এই গ্রন্থ। তাই ‘মুক্তির মিছিল দেখবে বলে’ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মানবিক মূল্যবোধ এবং সময়ের নির্মোহ সত্যকে ধারণ করা এক অতুলনীয় সৃষ্টি। গ্রন্থটি সময়ের দলিল এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গ্রন্থমালায় একটি মূল্যবান সংযোজন।
সাইফুল ইসলাম
লোকগবেষক ও গীতিকবি
Muktir Michil Dekhbe Bole - Abu Reza
নরকের Wi-Fi ও কয়েকশ ভবিষ্যৎ – শারদুল সজল
নরক পৃথিবীর সংযোগে আছে
প্রতিটি মস্তিষ্ক এখন অনলাইনে
পাসওয়ার্ড বদলালেও
নরকের সিগন্যাল ঠিক থাকে
অপমান, ক্ষুধা, যুদ্ধ, হতাশা ও একাকিত্ব
যেন অস্তিত্বের ছেঁড়া স্নায়ু
যাকে সেলাই করে মানুষ দৌড়ায়…
আর ভবিষ্যৎ?
একটা নয়—কয়েকহাজার
প্রতিটি—
অন্য ১ পৃথিবী, অন্য ১ তুমি
অন্য ১ আমি, অন্য ১ শেষ
নরক কী পৃথিবীর বাইরে?
নাকি পৃথিবীই নরক?
এই প্রশ্নে সক্রেটিস নক্ষত্র সেদ্ধ করে
ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঢেলে দিল জন্ম ও মৃত্যুর
মধ্যকার দূরত্ব
আর জন্ম হলো—
(শূন্যস্থান পূরণ করুন, যার যা মনে হয়…)
Naroker Wi-Fi O Kayeksha Vobisshat - Shardul Sajal
অক্ষরবৃত্তের জলে নামি – মোস্তফা তারিকুল আহসান
জীবনকে প্রচল ভেবে নিতে পারি নি বলেই হয়তোবা আমার ধানের ক্ষেতে অসময়ে
আসে বানের জল; পাকা ধান ডুবে যায় তবু মাছ ধরার স্বপ্ন উকি দেয় স্বপ্নভুক মাতালের মতো
আমি বানান ভুল করা বালকের দলে সারাজীবন ভাঙা টিনের চালের স্কুলের ছাত্র, মাস্টার
মশাইয়ের পাঠে বুঁদ হয়ে শিখতে পারিনি পাণিনি পতঞ্জলি; প্রকৃতির পাঠশালায় বনমোরগের ডাক
অথবা ভোরের কুয়াশামাখা মাঠ আমাকে কতিপয় ঘাসের ব্যাকরণ শিখিয়েছে। এই পথ্য নিয়েই
আমার জীবন বাহিত হয়েছে যমুনা মেঘনার বহতায়; নদী পয়োপ্তির ঘরে আমার ঘাসের
ছোট্ট মাঠে প্রজাপতির ঝাঁক আমাকে কবিতা শেখাতো, পলিমাটির লবণ নিয়ে মাছেদের কাছে
Aksharbretter Jale Nami
কুড়িয়ে পাওয়া ছায়া – ইসরাত জাহান
কেউ কেউ নিরন্তন হেঁটে চলে। চলতে চলতে মুখোমুখি হয় অগুনতি মানুষের। যাদের ছায়া দীর্ঘ অথবা হ্রস্ব। ছায়া পেরিয়ে ঐসব মানুষের প্রকৃত নাগাল পাওয়ার চেষ্টাও থেমে থাকে না।
প্রাগৈতিহাসিকের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে সে-ই সন্ধান মানিক বন্দোপাধ্যায়ই হয়তো শুরু করেছিলেন। এরপর আরও অনেকেই ঐ পথ অনুসরণ করেছে। দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তিতে কখনও কখনও ছায়ার ওপারের মানুষকে অস্বীকারও করা হয়েছে। ঘোষিত হয়েছে, ‘থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার।’ অন্ধকারের ফ্রেমে যদিও এভাবেই তারা অবয়বহীন থেকেছে, তবু লীন হয়ে যায়নি।
‘কুড়িয়ে পাওয়া ছায়া’ সেইসব অবয়বহীন মানুষের গল্প, যেখানে গল্প নির্মাণে অন্ধকার মূখ্য হয়ে উঠলেও আলোকে অস্বীকার করা হয়নি।
Kuriye Pauya Chaya - Israt Jahan
Pre-Order
প্রবন্ধ
নির্বাণমার্গের আগারিক কবি জীবনানন্দ – পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
এই বইটি জীবনানন্দের জীবন রহস্যের প্রগাঢ় এক পাঠ। মানবদেহ অর্থে নয়, যাপনের ধরন ও অর্থবহতায়। জীবনের টানাপোড়েন তাঁকে অস্বস্তি দিয়েছে। তবু তাঁকে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন। কে এই বনলতা? শিল্পী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির মোনালিসার মতোই সে রহস্যে ভরা। পাখির নীড়কে আশ্রয় করে চোখের উপমা চোখ বন্ধ করলেই যেন জীবন্ময় হয়ে ওঠে।
নির্জনতার কবি বলে তাকে অনেকেই লোকালয় থেকে দূরে ঠেলে দেয়। এ নিয়ে তার আপত্তি বরাবরই ছিলো। গুণমুগ্ধদের কাছে তিনি শুদ্ধতম কবি। কবিতার বিবেচনায় তিনি বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম কবি। কবিতার সংখ্যা সাকুল্যে একশো বাষট্টি। ‘ঝরাপালক’ নিয়ে তিরস্কৃত হলেও পরবর্তী কাব্যগ্রন্থ হতে নিজস্ব কাব্যভাষা ও শৈলীতে সিদ্ধ হয়ে ওঠেন।
শিক্ষক হিসেবে আদর্শ হলেও শিক্ষকতায় তার স্থিরতা মেলেনি। অনবরত প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষ পাল্টাতে হয়েছে। কখনও নিজের কারণে কখনও রোষানলে পড়ে। সংসার তার জন্যে আক্ষরিক অর্থেই ছিল কুরুক্ষেত্র। অস্বীকৃত ও অসংগত প্রেমের ছোট্ট ঘুলঘুলি দিয়েই তার জীবনে মিলেছিল কিছুটা আশার হাওয়া।
জীবনের ঘাতে পুড়ে পুড়ে খাঁটি সোনা হওয়া কবির লেখায় জগৎ শাস্তা বুদ্ধ প্রকট হয়ে ওঠেন অনিরুদ্ধ প্রজ্ঞায়, অতুলনীয় জ্যোতির্ময়তায়। নিবিড় পাঠে উপলব্ধি, তিনি নির্বাণমার্গের এক আগারিক কবি বুঝি। ছাপ্পান্ন বছরের জীবন সাহিত্যিক ব্যাপ্তিতে ছাড়িয়ে গেছে কয়েক হালি আকাশগঙ্গা। আপনভুবনে সুরসিক, বহির্ভুবনে রামগরুড়ের ছানার জীবনধারী কবি জীবনানন্দ দাশকে পড়ে পেরে ওঠা কঠিন। তবুও ভালোবেসে, অনুসন্ধিৎসা প্রশমনে উৎখননের প্রয়াসে ‘নির্বাণমার্গের আগারিক কবি’কে জাগিয়ে তোলা হলো কলমে, কল্পনায়।
Nirmanmarger Agarik Kobi Jibanananda - Pijush Kanti Barua
প্রতিপাদ্য গদ্যরেখা – ফকির ইলিয়াস
একটা কঠিন সময় পার করছে রাষ্ট্র ও সময়। চারিদিকে চরম স্থবিরতা! এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। যে বিষয়টি ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পরে প্রমাণিত হয়েছে- তা হলো, মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিহীন সাহিত্য খুবই ফ্যাকাশে। শিকড়ের অন্বেষণবিহীন প্রজন্ম ঠাঁইহীন।
একাত্তর বাঙালী জাতিসত্তার অহংকার। তা তো কোনোভাবেই ম্লান হতে পারে না। হতে দেওয়া যায় না। বিশ্ব আজ যুদ্ধের ক্রীড়াক্ষেত্র। কেন চলছে এই যুদ্ধ, তা ফিলিস্তিন, ইউক্রেন, ইরানের দিকে তাকালে বোঝার কোনো উপায় নেই। সাহিত্য-সংস্কৃতি তো রক্তযজ্ঞকে সমর্থন করে না। করতে পারে না।
আমার এই গ্রন্থের লেখাগুলো মানবতাবাদী পাঁজরকেই চিহ্নিত করার ক্ষুদ্র প্রয়াস মাত্র। প্রজন্মকে চিন্তাশীল সাহিত্যমানসে ধ্যানমগ্ন করার প্রচেষ্টা- বলা যায়। বৈশ্বিক, ভাষিক ও কালিক চেতনা এবং সমাকালকে ধারণ করার চেষ্টা করেছি প্রবন্ধগুলোতে। আমার বিশ্বাস সম্মানিত পাঠক-পাঠিকার ভালো লাগবে। অনুপ্রাণন প্রকাশন ও এর সত্ত্বাধিকারী বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা জনাব আবু মোহাম্মদ ইউসুফ-কে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা, এই প্রতিকূল সময়ে তারা বইটি প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছেন। সবাইকে শুভেচ্ছা। সকলের কল্যাণ হোক।
ফকির ইলিয়াস
২৫ এপ্রিল ২০২৬।
Protipadya Goddorekha - Fakir Elias
সংস্কৃতি প্রতিসংস্কৃতি – প্রদীপ দেওয়ানজী
বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নজনের তাগিদে কিছু লেখা আমাকে লিখতে হয়েছে। দীর্ঘদিন নাটকের সঙ্গে যুক্ত আছি। শুরুতে শখ, তারপর ভালোবাসা, পরবর্তী সময়ে দায় থেকে নাটক করেছি। এখনও করছি। নাটক করতে গিয়ে ভালো-মন্দ দুধরনের অভিজ্ঞতাই হয়েছে। অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারে আরও জমা হয়েছে- আজন্ম যা কিছু দেখেছি, শুনেছি আর ভেবেছি। যৎসামান্য পড়াশুনা আর সেসব অভিজ্ঞতাই গ্রন্থভুক্ত লেখাগুলোর ভিত্তি। তাই লেখাগুলো বাঁধা পথে হাঁটেনি। হেঁটেছে কখনও মসৃণ, কখনও আবার অমসৃণ পথে। আমার ভাবনাগুলো অন্যদের সাথে বিনিময় করতেই এ গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ।
গ্রন্থের সব লেখা প্রাবন্ধিক ও নাট্যগবেষক ড. ইউসুফ ইকবাল দেখে দিয়েছেন। আমি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। অনুপ্রাণন প্রকাশনের সত্ত্বাধিকারী আবু মোহাম্মদ ইউসুফ সংস্কৃতিবিষয়ক গ্রন্থটি প্রকাশ করেছেন। তাঁর কাছে আমার কৃতজ্ঞতা অশেষ। আমি কৃতজ্ঞ মোহাম্মদ রকিবুল হকের কাছে। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সংস্কৃতিকর্মীদেও কাছে বইটি পৌঁছে যাক এটাই আমার একমাত্র চাওয়া।
Sanskriri Protisanskriti - Prodeep Dewanjee
বাংলাদেশের কবি ও কবিতা (জন্ম : ১৯১১-১৯৬৫) – সম্পাদক : আবু মোহাম্মদ ইউসুফ
২০২২-এর বসন্তকালে একাদশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা প্রকাশের মধ্য দিয়ে শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন-এর সকল মুদ্রিত সংস্করণে নিয়মিতভাবে দেশের শিল্প, সাহিত্য, ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে আরও নিবিড়ভাবে তুলে ধরার জন্য শিল্প-সাহিত্যের বিশেষ ধরন, বিশেষ বিভাগ, বিশেষ ধারা অথবা বিশেষ বিষয় নিয়ে লেখা প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করে।
ফলে লেখক, পাঠক ও অনুপ্রাণন সম্পাদনা পরিষদের চাওয়া থেকে একাদশ বর্ষের প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ সংখ্যা চারটিতে নির্বাচিত কবি ও কবিতা সংখ্যা হিসেবে প্রকাশিত হয়। সংখ্যা ৪টিতে বাংলাদেশের ১০০ জন নির্বাচিত কবির সংক্ষিপ্ত জীবনী, প্রকাশনা, স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মাননা ও পুরস্কার, উল্লেখযোগ্য কবিতা ও তাদের রচিত কবিতারাশি নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা প্রকাশিত হয়। সম্মানিত এই কবিদের কবিতা নিয়ে আলাপ-আলোচনা ও আড্ডার অনুষ্ঠানের আয়োজনের মধ্য দিয়ে দেশের শিল্প ও সাহিত্যচর্চার বৃত্তটিকে প্রসারিত করার প্রয়াস গ্রহণ করতে কবিতাপ্রেমী পাঠকসমাজ এগিয়ে আসেন।
কালক্রমে পত্রিকার গুরুত্বপূর্ণ এই সংখ্যাগুলোর সংরক্ষণ ও প্রাপ্যতার সমস্যার কথা ভেবে আমরা অনুপ্রাণন সম্পাদকমণ্ডলী ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের একাদশ বর্ষের চারটি সংখ্যায় প্রকাশিত বাংলাদেশের ১০০ জন নির্বাচিত কবি যাদের জন্ম ১৯১১ থেকে ১৯৬৫-এর মধ্যে, তাদের কবিতা, জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা-সংক্রান্ত তথ্যাবলির পাশাপাশি তাদের উল্লেখযোগ্য কবিতা ও কবিতাকর্ম নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা একত্র করে একটি আকর গ্রন্থ প্রকাশ করার এই উদ্যোগ গ্রহণ করি।
আশা করি বাংলাদেশের কবি ও কবিতা-সংক্রান্ত তত্ত্ব, তথ্য ও বিশ্লেষণমূলক আলোচনা সম্পর্কে জ্ঞান আহরণে আগ্রহী বাংলা সাহিত্যের শিক্ষক, ছাত্র, গবেষক ও সাধারণ কবিতাপ্রেমী পাঠকের চাহিদা মেটাতে এই বই সক্ষম হবে।
Bangladesher Kobi O Kobita (Born : 1911-1965) - Editor : Abu Mohammed Yousuf
নাসরেদ্দিন হোজ্জা : একজন বুদ্ধিমান-বোকার গল্প – শেরজা তপন
তিনি কি একজন সুফি দার্শনিক? না কি নিছকই ভাঁড়?
তুরস্ক থেকে আজারবাইজান, ইরান থেকে চীন সব জায়গায় যার হাসির গল্পে মানুষ খুঁজে পেয়েছে গভীর প্রজ্ঞা, সেই নাসরেদ্দিন হোজ্জাকে নিয়ে এ এক বিস্ময়কর বই। বইটি পড়তে গিয়ে নতুন ধরনের পাঠ-অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ হয়েছি।
বহু শতাব্দী ধরে হোজ্জার নামের সাথে জড়িয়ে আছে অসংখ্য কিংবদন্তী ও কাহিনি। কিন্তু আসল মানুষটা কে ছিলেন, তা জানার প্রয়াস খুব কমজনই করেছেন। বিশেষ করে বাংলা ভাষায় এমন কাজ নজরে আসেনি। হয়তো এমন কাজ সমগ্র পৃথিবীতে এই প্রথম। লেখক এখানে ইতিহাস, লোকগাথা ও ধর্মদর্শনের আলোয় হোজ্জাকে পুনরাবিষ্কার করেছেন একজন চিন্তক, সমাজসচেতন ব্যঙ্গকার এবং সর্বোপরি এক অনন্য মানবপ্রেমিক হিসেবে।
বইটি পাঠককে শুধু হাসাবে না, ভাবাবে, আলোড়িত করবে। এতে আছে ইতিহাসের দলিল, সংস্কৃতির মেলবন্ধন এবং আন্দোলনের গল্প। একজন প্রজ্ঞাবান মোল্লার গল্পে আপনি খুঁজে পাবেন নিজের সমাজ, নিজের সময়, আর হয়তো নিজেকেও। প্রসঙ্গক্রমে আমরা কেউ কেউ শক্ত যুক্তি উপস্থাপন করতে বলে ফেলি তার দুএকটি গল্পও। এতদিন পরেও হোজ্জা তাই আজও প্রাসঙ্গিক দেশকালের গণ্ডি পেরিয়ে পৃথিবীব্যাপী।
Nasreddin Hozza : Ekjon Buddhiman Bokar Golpo - Sherza Tapon
কলমশিল্পী : স্মৃতিতে সৃজনে – মোহাম্মদ জয়নুদ্দীন
ড. মোহাম্মদ জয়নুদ্দীন-এর লেখালেখির হাতেখড়ি স্কুলজীবন থেকে। ছোটগল্প দিয়ে সূচনা; কবিতা, বেতার নাটক হয়ে বর্তমানে প্রবন্ধ-গবেষণা-স্মৃতিকথা রচনায় নিমগ্ন। প্রায় চার দশক তিনি বাংলাদেশ বেতারে নাট্যকার, নাট্যশিল্পী, কথক ও সাহিত্যবিষয়ক অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ছিলেন। টেলিভিশনের সাহিত্য অনুষ্ঠানেও তিনি সক্রিয়।
ড. মোহাম্মদ জয়নুদ্দীন সরকারি-বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানে শিল্পসাহিত্যসম্পর্কিত আলোচক, প্রাবন্ধিক, স্মারকবক্তা ও সভাপতি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। ব্যক্তিজীবনে তিনি বহু মনীষীর সাহচর্য পেয়েছেন। তাঁদের নিয়ে লেখেন স্মৃতিকথা আর প্রিয় সাহিত্যিকদের সাহিত্যকর্মের আলোকে রচনা করেন প্রবন্ধ। এ-সব স্মৃতিসঞ্চয় ও প্রবন্ধ নিয়েই বর্তমান গ্রন্থ- ‘কলমশিল্পী : স্মৃতিতে সৃজনে’।
Kalamshilpi : Smrityte Srijone - Mohammed Zainuddin
অণুগল্প
দর্পণ – অনুবাদ : আসাদ মিরণ মূল : এদুয়ার্দো গালেয়ানো
স্প্যানিশে Historia শব্দটি যেমন ‘ইতিহাস’ অর্থে ব্যবহৃত হয়, তেমনি ‘গল্প’ অর্থেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যদিও শাস্ত্রীয় বিচারে এ দুয়ের পার্থক্য সত্য ও মিথ্যার মতোই পরস্পর-বিরোধী। কিন্তু লাতিন আমেরিকান লেখকরা, বিশেষ করে কথাসাহিত্যিকরাই এই দুইয়ের ভেদরেখা বা পরস্পরবিরোধিতাকে কখনো কখনো এতটাই মুছে দিয়েছেন যে তা পড়তে গিয়ে মনে হবে ইতিহাস ও গল্প যেন সহোদরা। আর এই কারণে লাতিন আমেরিকান কোনো লেখকের গল্প বা আখ্যানগুলো ইতিহাস হয়ে ওঠার শোরগোল তুলে বৈষম্যবিরোধী পাঠকের ইতিহাসপাঠের ক্ষুধা মেটায়। কিন্তু বিপরীতে ঐতিহাসিকরা ওই রকম কিছু করেছেন কখনো? করাটাই ছিল স্বাভাবিক, কিন্তু এদুয়োর্দো গালেয়ানো আসার আগে পর্যন্ত কখনোই তা ঘটতে দেখা যায়নি। গালেয়ানো মূলত ঐতিহাসিক। অসামান্য সব ইতিহাস গ্রন্থের জনক। এক একটি গ্রন্থে তিনি ইতিহাসের শিরা-উপশিরা উন্মোচন করে দেখিয়েছেন মানুষের রক্তের ক্রন্দন। পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণী শক্তিতে তিনি অসামান্য এক ইতিহাসবিদ হলেও, The Mirror নামক বইটি লেখার আগে পর্যন্ত ইতিহাসের ঘটনাকে গল্পে রূপান্তরিত করার সৃজনী পরীক্ষা তিনি করেননি। বইটি একই সঙ্গে যেমন ইতিহাসের, তেমনি গল্পেরও। গল্প ও ইতিহাস এমন এক সঙ্গমে রঙিন হয়ে উঠেছে যা পাঠবিমুখ পাঠককেও উজ্জীবিত করে তোলে। এই গ্রন্থের আরও একটি বড় আকর্ষণ এর বৈশ্বিক পরিসর আর সর্বজনীনতা, কিন্তু গালেয়ানোর শৈল্পিক মিতভাষিতায় তা হয়ে উঠেছে বহনযোগ্য এক দর্পণের মতো, যেখানে যেকোনো কাল, যেকোনো জাতি, এমনকি ইতিহাস-বঞ্চিত অজ্ঞাতকুলশীল ব্যক্তিও তার নিজের চেহারা দেখে নিজেকে চিনে নিতে পারবে। এটি এমনই এক দর্পণ যেখানে পৃথিবীর অন্য সব মহাদেশের মতো আমাদের এই উপমহাদেশ, এমনকি রাজধানী ঢাকাসহ বাংলাদেশের ঘটনাও প্রতিফলিত হয়েছে ঐতিহাসিক নিষ্ঠায় আর সাহিত্যিক সুজনশীলতায়। অমূল্য হীরকখণ্ডের এই লোভনীয় ভার পাঠকদের হাতে তুলে দিচ্ছেন বিশ্বস্ত বাংলা তর্জমায় আসাদ মিরণ।
Dorpon (Mirror) by Eduardo Galeano. Translated by Asad Miron
রুখসানা কাজলের অণুগল্প
‘জল পড়ে, পাতা নড়ে’। ‘পাতা নড়ে’ এর স্পন্দনটা যদি এখানেই শেষ হয়ে যেত তাহলে কোনো কথাই ছিল না। আসলে তো ঝরেপড়া জলবিন্দু পাতার সাথে আমাদের অন্তরাত্মাকে নাড়াতে নাড়াতে নিয়ে যায় সমুদ্র থেকে মহাসমুদ্রে। অণুগল্প সে-রকমই কিছু।
রুখসানা কাজলের অণুগল্প
গরু চোর
গরুচোর
সেদিন এক গরুচোরের সাথে সাক্ষাত হয়ে গেল সবার, চোরটি নিজে থেকেই বলল—আমার নাম মজিদ। আমি একটা গরুচোর।
দলে নিয়োগ চলছিল। ইন্টার ডিস্ট্রিক বাস ডাকাতদলের সভাপতি জুম্মন খাঁ, অজ্ঞানপার্টি অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহ-সভাপতি, নিখিলবাংলা পকেটমার মহাসঙ্ঘের সেক্রেটারি বসা। এরাই দলের নিয়োগদাতা।
কিন্তু মজিদকে দেখে মোটেও গরুচোরের মতো লাগছিল না। গরুচোর হবে গরুচোরের মতো কিন্তু এরে সে রকম লাগছে না। এরে মকবুলের মতো লাগে।
মকবুল কে? মকবুল হলো মুরগি চোর। একসময় এই দলের হয়ে কাজ করত। এখন দল ভেঙে আলাদা দল করেছে। টেক্কা দিতে চায়।
অজ্ঞান স্পেশালিস্ট একাব্বর আলি সরু চোখে মজিদের দিকে তাকাল। তার ইচ্ছে করছে চোখেমুখে মলম ঘষে দিতে। একরাশ সন্দেহ নিয়ে বলল—তা মজিদ মিয়া, কয়টা গরু তুমি চুরি করছ?
মজিদ মাথা চুলকায়। ঘাড় চুলকায়। একটু লজ্জাও পায়। বলল—খুব বেশি না ওস্তাদ, আমি তো রেনডম গরু চুরি করি না। যখন কোরবানি আসে, গরুর হাটে ঘোরাঘুরি করে চান্সে চুরি করি। বছরে ওই একটাই সিজন আমার।
—তাই বল! একাব্বর হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। সন্দেহ আমার ঠিকই ছিল—ভাবতে ভাবতে সবার দিকে তাকিয়ে একটু ফুলে ওঠে, গর্বে। আসলে এই ব্যাটাকে মুরগি চোরের মতো লাগছিল। বিশ্বাসঘাতক মকবুলের চেহারার লগে মিল আছে। মকবুলও ছিল বিরাট মুরগি চোর।
—তা এইখানে কি মনে করে?
মজিদ বলল—ওস্তাদ, আমারে দলে নেন। চুরিধারী দল থেকে না করলে পোষায় না। একলা একলা ভালো লাগে না। মামারা ধরলে ছাড়ানোর কেউ থাকে না কোর্টে চালান খাইয়া যাই।
মজিদের কথায় সিদ্ধান্তের জন্যে সেক্রেটারি তাকায় সহ-সভাপতির দিকে, সহ-সভাপতি তাকায় সভাপতির দিকে। সভাপতি কারো দিকে না তাকিয়ে নিজের ডানহাতের চার আঙুলে পরা আংটির দিকে তাকিয়ে রইল। দুর্লভ পাথর বসানো সব আংটি। কোনোটি হীরা। ইয়াকুত আর লাল জমরুদ পাথরের আংটি দুটি নাকি খুবই বিখ্যাত। সাদা চুনি নাকি পৃথিবীর কোথাও নেই। একটিই। তাও জুম্মনের হাতে, ভাবা যায়! এই আংটিগুলির বৈশিষ্ট্য হলো ডান হাতে পরতে হয়। কিন্তু জুম্মনের হাতে মোট আঙুল চারটি। একবার ডাকাতি করতে গিয়ে গৃহস্থের দায়ের কোপে একটি আঙুল বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছিল। ফলে চার আঙুলেই আংটি পরতে হয়।
কাটা আঙুলের দিকে তাকিয়ে জুম্মন ডাকাত হতাশায় মাথা নাড়ে—মজিদ, গরুচোর মুরগি চোরের বিষয় না, আমরা এমন এক হাত সাফাইয়ের খোঁজ করছি, যে মুরগি নয়—মুরগির পিত্তথলি হাত চালিয়ে বাইরে আনতে পারবে, কিন্তু মুরগি টের পাবে না। পারবে?
ওস্তাদের কথায় খুব হতাশ হয়ে গেল গরুচোর মজিদ। চোখেমুখে পানি চলে এলো প্রায়। এত সুক্ষ্ম কাজ পারবে না সে। কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল—খুব ইচ্ছা ছিল আপনাদের সাথে কাজ করার। হলো না। বিদায় দেন ওস্তাদ।
বলে সবার সাথে হাত মিলিয়ে মজিদ চলে গেলে জুম্মন খাঁ নিজের আঙুলের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল—আমার আংটি, আমার আংটি!
…………
মকবুলের ডেরায় যখন মজিদ চারটি আংটি ছড়িয়ে দিল তখন খুব হাসাহাসি হলো, জুম্মন ওস্তাদের থোঁতা মুখ ভোঁতা হয়ে গেছে কল্পনা করে। হাত সাফাই অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে গেল মজিদ।
মকবুল কথা দিলে কথা রাখে।
গরুচোর
কালিয়াখোল গ্রামের ছোটরা
কালিয়াখোল গ্রামের ছোটরা
গ্রামের পাশে যে বিশাল বাদাম ক্ষেত আর ক্ষেতের পাশে যে ছোট নদী, সে নদীতে মাঝারি সব ঢেউ ওপার থেকে এপাড়ে আসে খড়কুটো মুখে নিয়ে। আর কত কিছু ভেসে আসে আর চলেও যায়—সারা দিনভর ছোটনেরা সেইসব দেখে পাড়ে বসে বসে।
ছোটনেরা মানে হলো—হাবিবুল, রতন, মোবারক, শেফালি বকুল এরা। কালিয়াখোল গ্রামের ছোটরা। তারা প্রতিদিন নদীতে আসে আর কাঁচা বাদাম খেতে খেতে লক্ষ করে নদীটাকে। নদীর ভেতরে কত কিছু। কাদাখোঁচা একটি দুটি। বালিয়া হাঁসের সাদা পাখনা উড়তে থাকে। আর ওপারের মেঘ যখন উড়তে উড়তে এপারে আসে তখন জলিল কাকার সময় হয় জোয়ালের গাই দুটাকে গোসল দেয়ার। গাই দুটার গোসল দেখতে দেখতে আর বাদাম খেতে খেতে দলের মধ্যে মোবারক নামে যে আছে, সে একটা প্রস্তাব দিল। প্রস্তাব দেয়ার আগে বিজ্ঞ বিজ্ঞ ভাব নিয়ে কয়েকটা জানাশোনা তথ্যও দিল। যেমন—এই নদীতে কিছুই ডোবে না।

বাকিরা মাথা নাড়ে—হুম।
গরু ডোবে না, খড় ডোবে না। নাও-লঞ্চ কিছুই ডোবে না। ভেলা ডোবে না।
সবাই মাথা নাড়ে। কাঁচা বাদাম খায়।
—চল আজকে একটা খেলা খেলি। মিনুরে ডুবাই দেই। দেখি ডোবে কি না?
ছোটনরা একজন আরেকজনের দিকে তাকায়। প্রস্তাবে জোর সমর্থন দেয় নুরু। প্রস্তাব সমর্থন নিয়ে নুরু কারো দিকে তাকায় না। নদীর পেটে জলের প্রবাহ দেখতে দেখতে তারা স্কুলঘর দেখে। দূরের আকাশছোঁয়া মিনার মসজিদ দেখে।
—মিনুও ডুবত না। এই নদীতে কিছুই ডোবে না–বলে সাহস দেয় নুরু। ততক্ষণে মিনুকে নিয়ে এসেছে মোবারক।
মিনু জল দেখে ভয় পায়। বলে—মিঁউ!
বিশাল নদী। বিশাল চর। মিনু ভয় পায়। ডাকাডাকি শুরু করে দেয়—মিঁউ মিঁউ।
মিনুকে কোলে নেয় হাবিবুল। হাবিবুল থেকে নেয় রতন। রতন থেকে নেয় শেফালি। শেফালি থেকে নেয় রাজন। রাজন থেকে নেয়া নুরু। নুরু থেকে কেউ নেয় না। কারণ নুরু কাউকে দেয় না। সে মিনুকে ছুড়ে দেয় নদীতে।
সবাই হাসে। মিনু সাঁতার কাটে। ঠিকমতো পারে না। নদীতে ঢেউ। তলিয়ে যায়। ছোট্ট মাথা। ডোবে ভাসে। সবাই হাসে–খুশিতে হাততালি দেয়।
দুই ঢেউয়ের চাপে পড়ে মিনু ডাকে—মিঁউ মিঁউ।
প্রাণপণ চেষ্টা করে মিনু কচি পা দিয়ে পাড়ে আসতে পারে না। দূরে সরে যায়। আবার আসে। পাড়ের কাছে আসেও। কিন্তু নুরুরা ঢিল ছোড়ে। হি হি করে হাসে। হাত তালি দেয়।
মিঁউ মিঁউ করতে করতে নদীর ভেতরে চলে যায় মিনু। ঢেউয়ের ভাঁজের ভেতরে চলে যায়। ডুবে যায়। পাড়ে বসে রাজন শিস দেয়।
…………
রাতের বেলায় বিছানায় শুয়ে শুয়ে পুরো ব্যাপারটা আবার দেখে ছোটন। মিনু ডুবে যাচ্ছে। ভেসে উঠছে। চিৎকার করে ওঠে ছোটন। ঘামে নেয়ে ওঠে সে। কিন্তু তার ঘুম ভাঙে না। ঘুমের মধ্যেই ছোটন বোঝে ঘুম না ভাঙলে সে নদী থেকে আর মিনুকে উঠাতে পারবে না।
সকালবেলা তাড়াতাড়ি মিনু যে কাজটি করে তা হলো ছোটনের বাবা-মাকে নিয়ে নদীর পাড় চলে এলো। তারা দেখল—নদীর ভেতরে একটা লাল জামা ভাসছে ছোটনের।
২৪১৯
কালিয়াখোল গ্রামের ছোটরা
জোড়া নারিকেল বাড়ি
হাতেগোনা যে-ক’জন লেখক অণুগল্পের ভিত্তি গাড়তে কিংবা প্রচার প্রসার করার মাধ্যমে প্রথম দশকেই একটি বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছেন কিংবা বলা যায়, অণুগল্পের বিভিন্ন ধরন এবং ধারণায় সাহিত্যের এ-মাধ্যমটি বর্তমানে বহুচর্চার ফল্গুধারায় দুইবাংলার পার ছাপিয়ে গেছে বটে, আশার কথা হচ্ছে, কামরুজ্জামান কাজল বিশুদ্ধ অণুগল্পের ধারক-বাহক হয়েই পাঠকমহলে দৃষ্টি আকর্ষণ করাতে সক্ষম হয়েছেন। পূর্ববর্তী ৩টি গ্রন্থে আমরা তা-ই দেখেছি। আর এখানেই প্রকৃত অণুগল্প আর কাজল সমার্থক হয়ে উঠেছেন।
‘জোড়া নারিকেল বাড়ি’ লেখকের চতুর্থ অণুগল্পের বই। বইটির সাফল্য কামনা করি।
-বিলাল হোসেন
জোড়া নারিকেল বাড়ি
রোজনামচা
রোজনামচা বা দিনলিপি কেন পড়ে মানুষ? কী দরকারে আসে এই দিনপঞ্জীপাঠ? স্যামুয়েল পেপিস (১৬৩৩-১৭০৩) কেন বিখ্যাত হয়ে গেলেন কেবলমাত্র ডায়েরি লিখে? কেননা তাঁর ডায়েরি তৎকালীন লন্ডনে (১৬৬৫) ছড়িয়ে পড়া মহামারী প্লেগ ও চারদিন (২রা-৬ই সেপ্টেম্বর, ১৬৬৬) ধরে চলা লন্ডন শহরকে পুড়িয়ে খাক করে দেওয়া বিধ্বংসী অগ্নিকা-ের অনুপুঙ্খ বিবরণ তাঁর ডায়েরিতে ধরেছেন পেপিস। যা আজ ইতিহাসের মর্যাদা পেয়েছে। কিংবা ধরুন, লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি’-র ‘নোটবুক’ বা পাবলো নেরুদার ‘মেমোয়্যার্স’ আমাদের কাছে আকর্ষণীয় কেন? না, যে যুগ আমরা পেরিয়ে এসেছি আর কোনোদিন যাওয়া যাবে না সেখানে, দিনপঞ্জী আমাদের নিয়ে যায় সে মুহূর্তক্ষণে! চিলেকোঠায় অথবা বহুদিন বন্ধ থাকা তোরঙ্গের গর্ভান্ধকার থেকে খুঁজে পাওয়া কোনো ডায়েরি এক অপরিসীম আনন্দে মন ভরায়, দেয় আবিষ্কারের আনন্দ-মূর্ছনা!
রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনস্মৃতি’-র যে অংশে কবি নানান মানুষের স্নান করার দৃশ্যের বর্ণনা দিচ্ছেন, সে ছবি রচনার মধ্যে সেই পুরোনো কলকাতার যে স্কেচ উঠে আসে, তা আর কোনোদিন ফিরে আসবে না, অথচ কী আশ্চর্য চিত্রময় লিপ্যাঙ্কন। মনের ভেতর ছবি হয়ে বেঁচে আছে শতাব্দী পেরিয়ে। এও তো সেই রোজনামচাই! কবিগুরুর অজস্র চিঠিতে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য তাৎক্ষণিকতা, ‘হে ক্ষণিকের অতিথি’ হিসেবে নানান দৃশ্যকল্প, ছবি সে-ও সেই দিনপঞ্জীর কথাই মনে করায়। পুরোনো দিন, পুরোনো সম্পর্ক সবই ধরা থাকে প্রকৃত শিল্পীর কলমে। সে কারণেই একজন শক্তিমান লেখকের লেখা রোজনামচা বা দিনলিপি আমাদের সাগ্রহবস্তু। যে দিন চলে গেছে, যাকে ধরে রাখতে পারিনি, সে সন্ধানে ডুব দিতে পারি ইচ্ছে করলেই। মনে করতে পারি, ‘বন্ধু কী খবর বল, কতদিন দেখা হয়নি!’
এ-কারণেই ‘রোজনামচা’-র বহুল প্রচার আশা করি।
সিদ্ধার্থ দত্ত
৮.১০.১৮
রোজনামচা
কবিতা
কবিতার গৃহস্থালি – ডালিয়া চৌধুরী
সবুজ গালিচায় বসে আছে দুজন
দু-দিকে মুখ করে
মধ্যিখানে গাঢ় সবুজ রয়ে যায় স্পর্শহীন,
বুকের ভেতর উথাল-পাথাল ঢেউ
রাজ্যের বিষণ্নতা।
দুজনের পথে ছড়িয়ে আছে ফণীমনসার কাঁটা
রোদ শাদা কপোতের সতর্কবাণী
ধ্রুব নক্ষত্র ঝরা রাতের অনিদ্র গতিরেখা।
ঘাসবনে শালিক জোড়ার কথোপকথনে
প্রজাপতি প্রদক্ষিণ করে সবুজ বেষ্টনী,
বাতাসে ভেসে আসা প্রণয় প্রতিস্বরে
দুজনে নদী অববাহিকায় ভেসে যেতে উদগ্রীব,
স্বপ্ন স্রোতের অনুকূলে, অথচ
প্রতিকূল স্রোত থেকে দীর্ঘশ্বাস নেয়।
শীতল দাঁড় টানা নাবিকের মতো
পাড়ি দিতে থাকে কুয়াশার উপকূল।
দুজন শুনতে থাকে মেঘের সংগীত,
তীব্র বর্ণিল বর্ষণে ভেসে যাওয়ার অপেক্ষায়
নোঙর ফেলে মহাকালের সমুদ্রে।
Kobitar Grihosthali
জলসন্ধি – সানজিদা সিদ্দিকা
ফুল হতে ফলে পরিণত হওয়ার জন্য প্রয়োজন পরাগায়নের। তাতে সাহায্য করে পাখি, বাতাস, ভ্রমর, প্রজাপতি প্রভৃতি। তেমনি কবির অন্তর্নিহিত ভাবকে ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করে কবিতা। আবার কবির ভাবকে নিজের ভাবের সাথে মিলিয়ে পাঠ করেন পাঠক। অতএব, বইয়ের অন্দরের কবিতা পড়ে পাঠক অন্তরে যা অনুভব করবেন তা-ই হলো জলসন্ধি-র নির্যাস। সেই নির্যাস আস্বাদন করতে কবির আহ্বান—পড়ুন পাঠক, কবির নামে।
Jolsondhi - Sanjida Siddiqua
নরকের Wi-Fi ও কয়েকশ ভবিষ্যৎ – শারদুল সজল
নরক পৃথিবীর সংযোগে আছে
প্রতিটি মস্তিষ্ক এখন অনলাইনে
পাসওয়ার্ড বদলালেও
নরকের সিগন্যাল ঠিক থাকে
অপমান, ক্ষুধা, যুদ্ধ, হতাশা ও একাকিত্ব
যেন অস্তিত্বের ছেঁড়া স্নায়ু
যাকে সেলাই করে মানুষ দৌড়ায়…
আর ভবিষ্যৎ?
একটা নয়—কয়েকহাজার
প্রতিটি—
অন্য ১ পৃথিবী, অন্য ১ তুমি
অন্য ১ আমি, অন্য ১ শেষ
নরক কী পৃথিবীর বাইরে?
নাকি পৃথিবীই নরক?
এই প্রশ্নে সক্রেটিস নক্ষত্র সেদ্ধ করে
ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঢেলে দিল জন্ম ও মৃত্যুর
মধ্যকার দূরত্ব
আর জন্ম হলো—
(শূন্যস্থান পূরণ করুন, যার যা মনে হয়…)
Naroker Wi-Fi O Kayeksha Vobisshat - Shardul Sajal
অক্ষরবৃত্তের জলে নামি – মোস্তফা তারিকুল আহসান
জীবনকে প্রচল ভেবে নিতে পারি নি বলেই হয়তোবা আমার ধানের ক্ষেতে অসময়ে
আসে বানের জল; পাকা ধান ডুবে যায় তবু মাছ ধরার স্বপ্ন উকি দেয় স্বপ্নভুক মাতালের মতো
আমি বানান ভুল করা বালকের দলে সারাজীবন ভাঙা টিনের চালের স্কুলের ছাত্র, মাস্টার
মশাইয়ের পাঠে বুঁদ হয়ে শিখতে পারিনি পাণিনি পতঞ্জলি; প্রকৃতির পাঠশালায় বনমোরগের ডাক
অথবা ভোরের কুয়াশামাখা মাঠ আমাকে কতিপয় ঘাসের ব্যাকরণ শিখিয়েছে। এই পথ্য নিয়েই
আমার জীবন বাহিত হয়েছে যমুনা মেঘনার বহতায়; নদী পয়োপ্তির ঘরে আমার ঘাসের
ছোট্ট মাঠে প্রজাপতির ঝাঁক আমাকে কবিতা শেখাতো, পলিমাটির লবণ নিয়ে মাছেদের কাছে
Aksharbretter Jale Nami
ছায়ার ভোঁ – চঞ্চল নাঈম
মুহূর্তের সন্দর্ভ দানকারী ব্যঞ্জনাকে চঞ্চল নাঈম এই কাব্যে একান্তে এঁকেছেন। অতিরিক্ত শব্দের ও অনুষঙ্গবিহীন চিত্রকল্পের আসক্তি নেই। এই কাব্যগ্রন্থের কবিতায় পর্যবেক্ষণগুলো স্বাভাবিক, তেমনি অস্বাভাবিকও। ছায়া, গণিত, ডট, অপেক্ষা, নৈঃশব্দ্য, শূন্যতা, সংখ্যা পরিমাপ, সম্ভাবনা ইত্যাদি বিষয়ে তীব্র উপলব্ধি আছে। বিমূর্তে না গিয়েও অপার বিস্ময় শিল্পদক্ষ কবির আয়ত্তে এসে গেছে। আমরা অনেক সময় ভাজ্য, ভাজক, ভাগফলকে মান্যতা দিই, ভাগশেষ ব্রাত্য থাকে। চঞ্চল নাঈম লিখছেন— ‘সব ভাগশেষ/অপ্রয়োজনীয় না।’ সত্যিই তো জীবনে কিছু না কিছু অবশিষ্ট থাকে বলেই, শুরু হয় নতুন কল্পনা। ‘বসে থাকা ঘড়ি’— নয়টি শব্দের কবিতা, যেখানে চিরকালীন বৈজ্ঞানিক সত্য আবর্তিত। আধুনিকতার নিয়ামক হলেও বিভিন্ন কারণে যন্ত্র রুদ্ধ হয়ে যায়। বাস্তবতার গতি কখনো রুদ্ধ হয় না। ‘ছায়ার ভোঁ’ নামকরণ থেকেই বিস্ময়। এরপর প্রতিটি কবিতায় চমক, ভিন্নভিন্ন পর্যবেক্ষণে। প্রতিটি কবিতার শিল্পসম্মত হয়ে ওঠা বিস্ময় সৃষ্টি করে। হয়ে ওঠার চারুশিল্পকে ভাষাদক্ষতার সঙ্গে নিষ্পন্ন করেছেন চঞ্চল নাঈম। কাঁথাস্টিচের সূক্ষ্ম-সূক্ষ্ম শৈল্পিক মেধা স্বল্পশব্দে ব্যবহৃত হয়েছে। ‘আমার ছায়া/মাটিতে পড়ে/কিন্তু/ওজন অনুভব করি না’— সহজ সত্য, কাব্যের সত্যে পরিণত। ডট চিহ্নকে নিয়ে কতো মধুর বচন রচিত হয়, সেটা ‘ডট’ কবিতার পাঠে বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষণীয়। এই কাব্যের প্রতিটি কবিতা বিমূর্ততা ছাড়াই জীবনের বহু না-দেখা অবস্থাকে ইঙ্গিত করছেন কবি।
অলোক বিশ্বাস
পশ্চিমবঙ্গ, ভারত
Chayar Vo - Chanchal Nayeem
নীল আগুনে পুড়ে গেছে বিশটি আঙুল – রেহানা বীথি
পৃথিবী নানাবিধ যুদ্ধে জর্জরিত। মানুষের শরীরের রক্ত মনের রক্ত ঝরছে অবিরাম এইসব নিদারুণ যুদ্ধের আঘাতে আঘাতে। মানুষকে ঘিরে আছে বোমা-বন্দুক : ঘিরে আছে ঝড়-ঝঞ্ঝা-বন্যা-খরা : ঘিরে আছে ক্ষুদ্রতম ও দীর্ঘতম নানারকম স্বার্থের ফিতা। মানুষের মুক্তি যেন নাই।
মুক্তি যে একবারেই নেই তা কিন্তু নয়, আছে। এই মুক্তির অপরূপ রূপ দেখার জন্য আমাদের প্রবেশ করতে হবে কবি রেহানা বীথির ‘নীল আগুনে পুড়ে গেছে বিশটি আঙুল’ কাব্যগ্রন্থে। প্রেমমাধুর্যে পূর্ণ কবিতার এই বইটি আমাদের দেখিয়ে দেয় হাজারও যুদ্ধ এবং যুদ্ধপ্রায় অবস্থা থেকে মুক্তির প্রয়োজন আর এই মুক্তি নিয়ে বসে আছে প্রেম। আমাদের পৌঁছতে হবে প্রেমের নরম পরশের কাছে। সেখানে পৌঁছতে পারলেই প্রেমের স্নিগ্ধ পরশে মানুষ পূর্ণ হবে; আনন্দের শস্যে ভরে উঠবে জীবন। এই আনন্দ শস্য থেকে জন্মে যাবে আরও আরও আনন্দ।
যুদ্ধের পক্ষে থাকা বোমা বারন্দ বন্দুক। যুদ্ধের পক্ষে থাকা ঝড় ঝঞ্ঝা বন্যা; যুদ্ধের পক্ষে থাকা ক্ষুদ্রতম বা দীর্ঘতম স্বার্থের ফিতা ক্ষয় হয়ে যাবে প্রেমের কোমল পরশে। কারণ ‘প্রীতিতে গন্ধরাজ’ ফোটে। কবিতাগুলো বলে দেয়- প্রেমের পাথর শুধু পাথর নয়, এ পাথর ‘আশ্চর্য পাথর’; প্রেমের যে আগুন তা ‘মিঠিমিঠি আগুন’ : প্রেমের ভেতর দিয়ে দেখা অন্ধকার ‘রঙিন অন্ধকার’, এ ‘অন্ধকারে সুগন্ধ’ আছে। প্রেমের ভেতর দিয়ে যা ঘটে তার সবই মানবিক; ব্যক্তিজীবনের জন্যেও, পৃথিবীয় জীবনের জন্যেও। সুতরাং প্রেমের ‘নীল আগুনে’ পোড়া বা প্রেমের জলে ভেজা দুই-ই শান্তির, দুই-ই অপার্থিব সুখের। প্রেম মধুর : প্রেমের কবিতা পড়া এবং তা অনুভব করাও মধুর। এসব কথা সত্য হয়ে আছে কবি রেহানা বীথির প্রেমবাস্তবতার কবিতাবই ‘নীল আগুনে পুড়ে গেছে বিশটি আঙুল’-এ। সুতরাং কবিতাবইটিতে ডুব দেওয়া যায় নির্দ্বিধায়।
আনিফ রুবেদ
কবি ও কথাকার
Neel Agune Pure Geche Bishti Angul - Rehana Bithi
উপন্যাস
মুক্তির মিছিল দেখবে বলে – আবু রেজা
‘মুক্তির মিছিল দেখবে বলে’ একটি ট্রিলজির সূচনাখণ্ড। দশটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত এই উপন্যাসে লেখক আবু রেজা মহান মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর সময়কে এক অনন্য কাঠমোয় রূপায়িত করেছেন। একটি পরিবারের শীর্ষকর্তা থেকে সর্বকনিষ্ঠ সদস্য পর্যন্ত সবার আনন্দ-বেদনা, উদ্বাস্তু জীবন, অনিশ্চয়তা ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে এক উত্তাল সময়ের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। এ আখ্যানের চরিত্রগুলোর যুদ্ধদিনের অভিজ্ঞতা পরিবারের ইতিহাস অতিক্রম করে স্বাধীনতাকামী জাতির আত্মত্যাগ, বেদনা ও মুক্তির অভিযাত্রার দলিলে পরিণত হয়েছে।
গ্রন্থটিতে স্থান পেয়েছে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের অভিঘাত, মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর নানান ঘটনা এবং বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের আবেগঘন মুহূর্ত। শিশুমনের বিস্ময়, ভয়, কৌতূহল ও স্বপ্নের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মিশে গেছে যুদ্ধদিনের নির্মম বাস্তবতা। এ আখ্যানের চরিত্রগুলোর প্রত্যক্ষ করা রক্তাক্ত দিনের স্মৃতি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে অতিক্রম করে জাতীয় স্মৃতির অংশ হয়ে উঠেছে।
এ উপন্যাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য গ্রাম ও শহরের জীবনবাস্তবতার সমান্তরাল উপস্থাপন। যুদ্ধের প্রতিঘাতে উদ্বাস্তু হয়ে ছুটে বেড়ানো একটি পরিবারের জীবন, মৃত্যুভয়, জীবনসংকট, আপনজনের নিরাপত্তাহীনতা এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শঙ্কা সংযত অথচ হৃদয়স্পর্শী ভাষায় বর্ণিত হয়েছে। একই সঙ্গে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতা, তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকারদের দেশবিরোধী কর্মকাণ্ড যেমন উঠে এসেছে, বিপরীতে সেই অন্ধকার সময়ে মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া আত্মীয়স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের ভূমিকাও গভীর মমতায় বিধৃত হয়েছে।
মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনার প্রতি লেখকের অবস্থান সুদৃঢ়, স্পষ্ট ও আপসহীন। তাঁর কাছে মুক্তিযুদ্ধ কেবল ইতিহাস নয়, জীবনবোধের ভিত্তি। তাই গ্রন্থের শেষে লেখক একটি প্রশ্ন রেখেছেন, যা পাঠককে ভাবিয়ে তুলবে—‘একাত্তরের যুদ্ধে শহীদ হয়েছে ত্রিশ লক্ষ প্রাণ। আবার এই বছরে জন্মেছেও পঁয়ত্রিশ লক্ষের বেশি শিশু। মহৎপ্রাণের বিনিময়ে শিশুপ্রাণ। এই শিশুরা বড়ো হয়ে পারবে কি পূর্বপুরুষের মহত্ত্বের মূল্য দিতে?’ নিশ্চয়ই বর্তমান সময়ই এর উৎকৃষ্ট উত্তর।
মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার, ইতিহাসচেতনা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দায়বোধ নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে এই গ্রন্থ। তাই ‘মুক্তির মিছিল দেখবে বলে’ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মানবিক মূল্যবোধ এবং সময়ের নির্মোহ সত্যকে ধারণ করা এক অতুলনীয় সৃষ্টি। গ্রন্থটি সময়ের দলিল এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গ্রন্থমালায় একটি মূল্যবান সংযোজন।
সাইফুল ইসলাম
লোকগবেষক ও গীতিকবি
Muktir Michil Dekhbe Bole - Abu Reza
স্ট্রিট ডকুমেন্টারি – শেখর সিরাজ
ঢাকা শহর কখনও ঘুমায় না। শুধু আলো নিভে গেলে তার আরেকটি মুখ দেখা যায়। একজন তরুণ লেখক ও নাট্যকর্মী আরমান রহমান, রাজনৈতিক মামলার পর ফিরে এসে আবিষ্কার করে—শহরের নিখোঁজ মানুষ, ভাঙা সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক মুখোশ আর ক্ষমতার অদৃশ্য নেটওয়ার্ক একই সুতোয় বাঁধা। তার পাশে দাঁড়ায় মনোবিজ্ঞানের ছাত্রী ঋতভা, যে মানুষের মন বুঝতে গিয়ে উন্মোচন করে এমন এক গোপন নথি, যা বহু প্রভাবশালী মানুষের অন্ধকার মুখ প্রকাশ করতে পারে। কিন্তু সত্যের মূল্য সবসময় রক্তে পরিশোধ করতে হয়। থিয়েটার, বিশ্ববিদ্যালয়, শাহবাগ, বইমেলা, ফুটপাত, প্রেম, প্রতিবাদ এবং রাষ্ট্রীয় নীরবতার ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলে স্ট্রিট ডকুমেন্টারি—একটি সিনেম্যাটিক রাজনৈতিক থ্রিলার, যেখানে অসমাপ্ত প্রেম ও অসমাপ্ত সত্য একই গল্পের দুই প্রান্ত। শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—একজন মানুষ মারা গেলে কি তার ভাষাও মরে যায়?
Street Documentary - Shekhor Siraj
অতীতের আলপনা – সুরঞ্জনা মায়া
মানুষের জীবন কি কেবল কতগুলো বছরের সমষ্টি, নাকি সে এক পলল ভূমি? যেখানে জমে থাকে ইতিহাসের পলিমাটি, শৈশবের মায়া আর ঘ্রাণমাখা সব স্মৃতি? ‘অতীতের আলপনা’ বইটিতে সুরঞ্জনা মায়া তাঁর স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বসেছেন ঠিক সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে।
এটি কেবল এক ব্যক্তির আত্মজীবনী নয়, এটি একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলির এক অনন্য সামাজিক দলিল। যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে শুরু করে সুরমা পাড়ের হাড়কাঁপানো শীত, কিংবা বীরাঙ্গনা মায়েদের দীর্ঘশ্বাস আর যুদ্ধশিশুদের বিদেশের মাটিতে শেকড় সন্ধানের যে হাহাকার- লেখিকার কলমে তা যেন এক একটি জীবন্ত চিত্রপট হয়ে ধরা দিয়েছে। ইতিহাসের সেই বিশাল ক্যানভাসে তিনি খুব নিপুণভাবে এঁকেছেন নিজের যাপিত জীবনকে। যেখানে ময়মনসিংহের কৈশোরের বন্ধুদের সাথে কাটানো রোদেলা দুপুর আছে, আছে সিলেটের সেই আসাম টাইপ বাংলোর বারান্দা, আর আছে সুরমা তীরের সেই মায়াভরা দিনগুলো।
এই বইটির অনন্যতা এর ডিটেইলিং-এ। লেখিকা যেভাবে সেই সময়ের রেশনিং ব্যবস্থার বিস্বাদ চাল, চর্বি ভাজা পিঠা কিংবা প্রত্যন্ত গ্রামের সেই অকৃত্রিম আতিথেয়তার স্বাদ বর্ণনায় এনেছেন, তা পাঠককে এক নস্টালজিক ভ্রমণে নিয়ে যাবে। বড়োদের ভুল বোঝাবুঝিতে কিশোরী মনের সেই ‘বাজে মেয়ে’ অপবাদ থেকে শুরু করে তেত্রিশ বছর পর বন্ধুর সাথে সেই অমীমাংসিত দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার যে দর্শন- তা আমাদের শিখিয়ে দেয় ক্ষমা আর ভালোবাসার শক্তি।
নাতনিদের কৌতূহলী প্রশ্নের উত্তরে লেখা এই বইটি আসলে আমাদের ফেলে আসা সেই সময়ের প্রতিচ্ছবি। যারা ইতিহাসকে শুকনো তথ্যের বাইরে রক্ত-মাংসের আবেগ দিয়ে অনুভব করতে চান, তাঁদের জন্য ‘অতীতের আলপনা’ এক অনিবার্য পাঠ। এক জীবনের আনন্দ-বেদনা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি আর দেশপ্রেমের এই আলপনা প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে দীর্ঘস্থায়ী দাগ কাটবে।
Otiter Alpona - Suranjona Maya
নিয়ন্ত্রক – মঞ্জু সরকার
এক পার্কিনসন রোগীর অস্বাভাবিক কম্পিত জীবনে অনুভূত হয় অস্থির সময়ের স্পন্দন। গ্রামীণ সামন্তবাদী পরিবার থেকে উঠে আসা দুই ভাই বাচ্চু ও সাচ্চু। একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা বাচ্চু গৃহত্যাগী হয়ে স্বাধীন দেশে সমাজতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের রাজনীতিতে নিবেদিত, বিপ্লবী ও নাস্তিক। অন্যদিকে সাচ্চু আজন্ম ভীরু স্বভাবের আস্তিক, পারিবারিক দায়-দায়িত্ব পালনে ব্যাংকের বাঁধা চাকরিজীবী। দুরারোগ্য পার্কিনসন রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর আত্মনিয়ন্ত্রণে অক্ষম সাচ্চু জীবনের গভীর-গোপন সত্য শোনাতে স্মৃতিকথা লেখে। যাপিতজীবনের বাস্তবে ও কল্পলোকে চাওয়া-পাওয়ার সরস বয়ানে একদিকে বিবাহ নামক সম্পর্কের বিষগেরোর যন্ত্রণা, অন্যদিকে ভালোবাসার বিকৃত ফাঁদে আনন্দ-তৃষ্ণায় অবিস্মরণীয় হয়ে ওঠে মারিয়া, হেনা, শেফালি, টিয়া প্রমুখ নারীচরিত্র। উন্মোচিত হয় সমাজের কদর্য চেহারা। সাচ্চুর জীবনকথা পাঠকমনেও প্রশ্ন জাগায়, পরিবারের ভাঙা-গড়া, স্বার্থের সংঘাত এবং সুখ-অসুখে আন্দোলিত জীবনের প্রকৃত নিয়ন্ত্রক আসলে কে?
Niontrok - Manju Sarkar
দিঘিমন – রাহমান ওয়াহিদ
লেখকের প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ
কবিতানীল জল সমুদ্দুরে যাবো (কবিতাগ্রন্থ, ২০০৯ সাল) অর্ধেক তুমি বাকিটা অন্য কেউ (কবিতাগ্রন্থ, ২০১০ সাল) শেকড়ে বকুলের গন্ধ (কবিতাগ্রন্থ, ২০১১ সাল) ভেঙে ভেঙে জেগে থাকে নদীর হৃদয় (কবিতাগ্রন্থ, ২০১২ সাল) ধুলো অক্ষরের চিঠি (কবিতাগ্রন্থ, ২০১৩ সাল) কেউ কখনও বাড়ি ফেরে না (কবিতাগ্রন্থ, ২০১৪ সাল) মৃত নক্ষত্রের শহরে (কবিতাগ্রন্থ, ২০১৫ সাল) ভালোবাসাও ভ্রমণে যায় (কবিতাগ্রন্থ, ২০২২ সাল)
শিশুতোষ গল্পগ্রন্থ
পাগলা রাজার টেনশন (শিশুতোষ গল্পগ্রন্থ, ২০১২ সাল) পিকু ও পাখি (শিশুতোষ গল্পগ্রন্থ, ২০১২ সাল) ভূতকন্যা (শিশুতোষ গল্পগ্রন্থ, ২০১৩ সাল) নীল ঝরনার দেশে (শিশুতোষ গল্পগ্রন্থ, ২০১৩ সাল) পিংকি ও একটি লাল গোলাপ (শিশুতোষ গল্পগ্রন্থ, ২০১৪ সাল) হঠাৎ দুরন্ত মুক্তিসেনা (শিশুতোষ গল্পগ্রন্থ, ২০১৪ সাল) গল্পগুলো ছোটদের (শিশুতোষ গল্পগ্রন্থ, ২০১৪ সাল) খেজুর গাছে ভূতের পা (শিশুতোষ গল্পগ্রন্থ, ২০২৩ সাল) তিন মাথার সেই মানুষটা (শিশুতোষ গল্পগ্রন্থ, ২০২৫ সাল)
গল্পগ্রন্থ
বন্দুকে ফুটো (গল্পগ্রন্থ, ২০২০ সাল) স্বপ্নছোঁয়ার পদযাত্রা (গল্পগ্রন্থ, ২০২৪ সাল)
উপন্যাস
মুক্তিযুদ্ধের ভিন্ন এক রণাঙ্গনে (উপন্যাস, ২০১৬ সাল) মুখোমুখি মোহনায় (উপন্যাস, ২০১৭ সাল) আতোর-আদুরি উপাখ্যান (আঞ্চলিক ভাষার উপন্যাস, ২০১৯ সাল) বিহঙ্গ সময়ের অ্যালব্যাম (আত্মজৈবনিক গ্রন্থ, ২০২২ সাল)।
Dighimon - Rahman Wahid
অভিনেত্রী – শাপলা সাদী
ভারতের তৈরি করা নীলনকশার নতুন একটা প্রজেক্টের জন্য তাদেরকে এই শিপে ডেকে পাঠানো হয়েছে গোপন মিটিং করা এবং জরুরি কিছু নথি আদান প্রদানের জন্য। প্রথমে তারা বাংলাদেশ থেকে বাই এয়ারে মাদাগাস্কার এসেছে। তারপর মাদাগাস্কার থেকে ১৩২ কিলোমিটার দূরসমুদ্রে হেলিকপ্টার নিয়ে এই ক্রুজ শিপে অবতরণ করেছে। তাদের ম্যাডাম নন্দিতা মিত্র তাদেরকে বাংলাদেশ থেকে এখানে এসে দেখা করতে বলেছে। বলা হয়েছে নতুন একটা কনট্র্যাক্ট আছে। সফলভাবে করে দিতে পারলে ভারত সরকার আরও কোটি কোটি টাকা দিয়ে তাদের সুইস অ্যাকাউন্টগুলোকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে ঢোল বানিয়ে দেবে। টাকার গন্ধ পেয়ে বাংলাদেশের মন্ত্রণালয়ের চার কুকুর নাচতে নাচতে ভারতের দালালি করতে চলে এসেছে।
তারপর…
Ovinetri - Shapla Shadi
পেপার ব্যাক
সিমান্তিনী
ভূমিকা
‘সীমান্তিনী’ আমার লেখা দীর্ঘ কবিতার মধ্যে অন্যতম। বারোটি কবিতা নিয়ে এই বইটি। কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে প্রেমের পাশাপাশি পাহাড়ি সৌন্দর্য, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী গারো, হাজং প্রভৃতি আদিবাসীদের সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য ও তাদের জীবনধারা। পাহাড়ি নারীর সৌন্দর্য, বালুকণা, সমুদ্র, আঁকাবাঁকা-উঁচুনিচু পথের দৃশ্যও এই বইতে চিত্রিত হয়েছে। প্রতিটি কবিতার পাতা রাঙানো হয়েছে ভালোবাসার রঙে।
কিসিঞ্জার ভূঁইয়া
০১ সেপ্টেম্বর, ২০২০
সীমান্তিনী
গরু চোর
গরুচোর
সেদিন এক গরুচোরের সাথে সাক্ষাত হয়ে গেল সবার, চোরটি নিজে থেকেই বলল—আমার নাম মজিদ। আমি একটা গরুচোর।
দলে নিয়োগ চলছিল। ইন্টার ডিস্ট্রিক বাস ডাকাতদলের সভাপতি জুম্মন খাঁ, অজ্ঞানপার্টি অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহ-সভাপতি, নিখিলবাংলা পকেটমার মহাসঙ্ঘের সেক্রেটারি বসা। এরাই দলের নিয়োগদাতা।
কিন্তু মজিদকে দেখে মোটেও গরুচোরের মতো লাগছিল না। গরুচোর হবে গরুচোরের মতো কিন্তু এরে সে রকম লাগছে না। এরে মকবুলের মতো লাগে।
মকবুল কে? মকবুল হলো মুরগি চোর। একসময় এই দলের হয়ে কাজ করত। এখন দল ভেঙে আলাদা দল করেছে। টেক্কা দিতে চায়।
অজ্ঞান স্পেশালিস্ট একাব্বর আলি সরু চোখে মজিদের দিকে তাকাল। তার ইচ্ছে করছে চোখেমুখে মলম ঘষে দিতে। একরাশ সন্দেহ নিয়ে বলল—তা মজিদ মিয়া, কয়টা গরু তুমি চুরি করছ?
মজিদ মাথা চুলকায়। ঘাড় চুলকায়। একটু লজ্জাও পায়। বলল—খুব বেশি না ওস্তাদ, আমি তো রেনডম গরু চুরি করি না। যখন কোরবানি আসে, গরুর হাটে ঘোরাঘুরি করে চান্সে চুরি করি। বছরে ওই একটাই সিজন আমার।
—তাই বল! একাব্বর হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। সন্দেহ আমার ঠিকই ছিল—ভাবতে ভাবতে সবার দিকে তাকিয়ে একটু ফুলে ওঠে, গর্বে। আসলে এই ব্যাটাকে মুরগি চোরের মতো লাগছিল। বিশ্বাসঘাতক মকবুলের চেহারার লগে মিল আছে। মকবুলও ছিল বিরাট মুরগি চোর।
—তা এইখানে কি মনে করে?
মজিদ বলল—ওস্তাদ, আমারে দলে নেন। চুরিধারী দল থেকে না করলে পোষায় না। একলা একলা ভালো লাগে না। মামারা ধরলে ছাড়ানোর কেউ থাকে না কোর্টে চালান খাইয়া যাই।
মজিদের কথায় সিদ্ধান্তের জন্যে সেক্রেটারি তাকায় সহ-সভাপতির দিকে, সহ-সভাপতি তাকায় সভাপতির দিকে। সভাপতি কারো দিকে না তাকিয়ে নিজের ডানহাতের চার আঙুলে পরা আংটির দিকে তাকিয়ে রইল। দুর্লভ পাথর বসানো সব আংটি। কোনোটি হীরা। ইয়াকুত আর লাল জমরুদ পাথরের আংটি দুটি নাকি খুবই বিখ্যাত। সাদা চুনি নাকি পৃথিবীর কোথাও নেই। একটিই। তাও জুম্মনের হাতে, ভাবা যায়! এই আংটিগুলির বৈশিষ্ট্য হলো ডান হাতে পরতে হয়। কিন্তু জুম্মনের হাতে মোট আঙুল চারটি। একবার ডাকাতি করতে গিয়ে গৃহস্থের দায়ের কোপে একটি আঙুল বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছিল। ফলে চার আঙুলেই আংটি পরতে হয়।
কাটা আঙুলের দিকে তাকিয়ে জুম্মন ডাকাত হতাশায় মাথা নাড়ে—মজিদ, গরুচোর মুরগি চোরের বিষয় না, আমরা এমন এক হাত সাফাইয়ের খোঁজ করছি, যে মুরগি নয়—মুরগির পিত্তথলি হাত চালিয়ে বাইরে আনতে পারবে, কিন্তু মুরগি টের পাবে না। পারবে?
ওস্তাদের কথায় খুব হতাশ হয়ে গেল গরুচোর মজিদ। চোখেমুখে পানি চলে এলো প্রায়। এত সুক্ষ্ম কাজ পারবে না সে। কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল—খুব ইচ্ছা ছিল আপনাদের সাথে কাজ করার। হলো না। বিদায় দেন ওস্তাদ।
বলে সবার সাথে হাত মিলিয়ে মজিদ চলে গেলে জুম্মন খাঁ নিজের আঙুলের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল—আমার আংটি, আমার আংটি!
…………
মকবুলের ডেরায় যখন মজিদ চারটি আংটি ছড়িয়ে দিল তখন খুব হাসাহাসি হলো, জুম্মন ওস্তাদের থোঁতা মুখ ভোঁতা হয়ে গেছে কল্পনা করে। হাত সাফাই অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে গেল মজিদ।
মকবুল কথা দিলে কথা রাখে।
গরুচোর
কালিয়াখোল গ্রামের ছোটরা
কালিয়াখোল গ্রামের ছোটরা
গ্রামের পাশে যে বিশাল বাদাম ক্ষেত আর ক্ষেতের পাশে যে ছোট নদী, সে নদীতে মাঝারি সব ঢেউ ওপার থেকে এপাড়ে আসে খড়কুটো মুখে নিয়ে। আর কত কিছু ভেসে আসে আর চলেও যায়—সারা দিনভর ছোটনেরা সেইসব দেখে পাড়ে বসে বসে।
ছোটনেরা মানে হলো—হাবিবুল, রতন, মোবারক, শেফালি বকুল এরা। কালিয়াখোল গ্রামের ছোটরা। তারা প্রতিদিন নদীতে আসে আর কাঁচা বাদাম খেতে খেতে লক্ষ করে নদীটাকে। নদীর ভেতরে কত কিছু। কাদাখোঁচা একটি দুটি। বালিয়া হাঁসের সাদা পাখনা উড়তে থাকে। আর ওপারের মেঘ যখন উড়তে উড়তে এপারে আসে তখন জলিল কাকার সময় হয় জোয়ালের গাই দুটাকে গোসল দেয়ার। গাই দুটার গোসল দেখতে দেখতে আর বাদাম খেতে খেতে দলের মধ্যে মোবারক নামে যে আছে, সে একটা প্রস্তাব দিল। প্রস্তাব দেয়ার আগে বিজ্ঞ বিজ্ঞ ভাব নিয়ে কয়েকটা জানাশোনা তথ্যও দিল। যেমন—এই নদীতে কিছুই ডোবে না।

বাকিরা মাথা নাড়ে—হুম।
গরু ডোবে না, খড় ডোবে না। নাও-লঞ্চ কিছুই ডোবে না। ভেলা ডোবে না।
সবাই মাথা নাড়ে। কাঁচা বাদাম খায়।
—চল আজকে একটা খেলা খেলি। মিনুরে ডুবাই দেই। দেখি ডোবে কি না?
ছোটনরা একজন আরেকজনের দিকে তাকায়। প্রস্তাবে জোর সমর্থন দেয় নুরু। প্রস্তাব সমর্থন নিয়ে নুরু কারো দিকে তাকায় না। নদীর পেটে জলের প্রবাহ দেখতে দেখতে তারা স্কুলঘর দেখে। দূরের আকাশছোঁয়া মিনার মসজিদ দেখে।
—মিনুও ডুবত না। এই নদীতে কিছুই ডোবে না–বলে সাহস দেয় নুরু। ততক্ষণে মিনুকে নিয়ে এসেছে মোবারক।
মিনু জল দেখে ভয় পায়। বলে—মিঁউ!
বিশাল নদী। বিশাল চর। মিনু ভয় পায়। ডাকাডাকি শুরু করে দেয়—মিঁউ মিঁউ।
মিনুকে কোলে নেয় হাবিবুল। হাবিবুল থেকে নেয় রতন। রতন থেকে নেয় শেফালি। শেফালি থেকে নেয় রাজন। রাজন থেকে নেয়া নুরু। নুরু থেকে কেউ নেয় না। কারণ নুরু কাউকে দেয় না। সে মিনুকে ছুড়ে দেয় নদীতে।
সবাই হাসে। মিনু সাঁতার কাটে। ঠিকমতো পারে না। নদীতে ঢেউ। তলিয়ে যায়। ছোট্ট মাথা। ডোবে ভাসে। সবাই হাসে–খুশিতে হাততালি দেয়।
দুই ঢেউয়ের চাপে পড়ে মিনু ডাকে—মিঁউ মিঁউ।
প্রাণপণ চেষ্টা করে মিনু কচি পা দিয়ে পাড়ে আসতে পারে না। দূরে সরে যায়। আবার আসে। পাড়ের কাছে আসেও। কিন্তু নুরুরা ঢিল ছোড়ে। হি হি করে হাসে। হাত তালি দেয়।
মিঁউ মিঁউ করতে করতে নদীর ভেতরে চলে যায় মিনু। ঢেউয়ের ভাঁজের ভেতরে চলে যায়। ডুবে যায়। পাড়ে বসে রাজন শিস দেয়।
…………
রাতের বেলায় বিছানায় শুয়ে শুয়ে পুরো ব্যাপারটা আবার দেখে ছোটন। মিনু ডুবে যাচ্ছে। ভেসে উঠছে। চিৎকার করে ওঠে ছোটন। ঘামে নেয়ে ওঠে সে। কিন্তু তার ঘুম ভাঙে না। ঘুমের মধ্যেই ছোটন বোঝে ঘুম না ভাঙলে সে নদী থেকে আর মিনুকে উঠাতে পারবে না।
সকালবেলা তাড়াতাড়ি মিনু যে কাজটি করে তা হলো ছোটনের বাবা-মাকে নিয়ে নদীর পাড় চলে এলো। তারা দেখল—নদীর ভেতরে একটা লাল জামা ভাসছে ছোটনের।
২৪১৯
কালিয়াখোল গ্রামের ছোটরা
প্রেমালিঙ্গম
ঝুমকি
কত পথ পার হলাম ঝুমকি;
তবু মানুষ চেনা হলো না!
বারো প্যাচের নারী, চোখে জড়িচুমকির খেল্ দেখালো
অমলেশ সেই দেখে দেখে শেষে উন্মাদের খাতায় নাম লেখালো
পত্রিকার শেষ পাতায় ওকে নিয়ে কতো ফিচার হলো
তবুও অমলেশকে কেউ ভালোবাসলো না।
ঝুমকি পৃথীবির সবচে’ হিংস্র প্রাণী মানুষের
গায়ে বিপদের গন্ধ লেগে আছে;
ফাঁক পেলেই নষ্টামি করতে লেগে যায়
কেউ কেউ বলে সত্যিকারের ভালোবাসা নেই
বড় র্দূভাগা ওরা!
সত্যিকারের ভালোবাসাই দেখেনি চোখে; পাবে কোত্থেকে
প্রেমালিঙ্গম
সরদার ফারুকের ১০০ কবিতা
ভূমিকা-
আমার ৪টি কবিতার বই বিভিন্ন সময়ে কলকাতা এবং আগরতলা থেকে প্রকাশিত হয়েছে।
বাংলাদেশের পাঠক বইগুলো হাতে পাননি বলেই সেখান থেকে ১০০টি কবিতা বাছাই করে এই প্রকাশনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অনুপ্রাণন প্রকাশনের প্রাণপুরুষ শ্রদ্ধাভাজন আবু এম ইউসুফ ভাইয়ের সহৃদয় সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞ।
অনুজপ্রতিম তুহিন ভূঁইয়ার অক্লান্ত পরিশ্রমের জন্য অনেক ধন্যবাদ।
৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৯
রূপনগর আবাসিক এলাকা
মিরপুর, ঢাকা।
সরদার ফারুকের ১০০ কবিতা
অন্যান্য
ফিরোজা রঙের দেশ – ফাতিমা জাহান
খ্রিস্টের জন্মের প্রায় হাজার বছর আগে লোকালয় গড়ে ওঠে উযবেকিস্তানে। মধ্য এশিয়ায় উযবেকিস্তান প্রথম জনপদ যেখানে তুর্ক জনগোষ্ঠী বসবাস করতে শুরু করে এবং সেচের মাধ্যমে চাষাবাদ করা শুরু করে। এক সময় আলেক্সান্ডার দা গ্রেট এই জনপদ নিজের অধীনে করে নিয়েছিলেন।
খ্রিস্টের জন্মের কয়েকশো বছর আগে চীন থেকে বণিকরা আরব ও ইউরোপে সিল্ক, মসলা, দামি পাথর, চা ইত্যাদি বাণিজ্য করার উদ্দেশ্যে মধ্য এশিয়ার পথ ধরে যাত্রা শুরু করেন। সেই থেকে সিল্ক রোড বা রেশম পথ মানচিত্রে উল্লেখযোগ্য স্থান করে নেয়। দেড় হাজার বছরের বেশি সময় রেশম পথ ধরে বণিকরা নিয়মিত যাতায়াত করেছিলেন।
আল বুখারি, আল তিরমিজি, ইবনে সিনা, আল বিরুনি, সম্রাট বাবরের মতো বিখ্যাত ব্যক্তি উযবেকিস্তানে জন্মগ্রহণ করেছেন। ইবনে বতুতা, মার্কো পোলো, ওমর খৈয়ামের পায়ের ধুলা পড়ে এই ভূমি ধন্য হয়েছে।
মায়োলিকা শিল্প, ইকাত কাপড়, তামা ও কাঠ শিল্প বিমূর্ত থেকে মূর্ত হয়েছে শিল্পীদের হাতে।
চেঙ্গিস খান থেকে আমির তিমুর বা আরও পরের আমিরগণ শুধু যোদ্ধাই ছিলেন না, সুশাসক ও শিল্প-সাহিত্যের বোদ্ধাও ছিলেন।
উযবেকিস্তানে লেখকের ভ্রমণ সেই শিল্প-সাহিত্য ও রেশম পথের বাঁকে বাঁকে চলে গিয়েছে। এক জনপদ থেকে অন্য জনপদে শুধু রেশম পথের দিশাই নেই, সাথে আছে প্রাচীন স্থাপনা ও সাধারণ মানুষের গল্প।
Firoza Ronger Desh - Fatima Jahan
ফেসবুক রঙ্গ রসিকতা – গ্রন্থনা ও সম্পাদনা শফিক হাসান
ফেসবুক কি সময় নষ্ট করায়, দিয়ে যায় ক্লান্তি-হতাশা?
না; ফেসবুকের প্রাপ্তিও কম নয়। ইতিবাচক ব্যবহার করা গেলে। বিনোদনের দুনিয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হয়ে উঠেছে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। বাঙালি জন্ম থেকে রসিক। কথাবার্তা থেকে যাপিত জীবনের কাজ-কর্মে রসবোধের পরিচয় মেলে। ফেসবুকও হয়ে উঠছে রসাধার।
কেউ কেউ স্ট্যাটাসে এমন সব কথা লেখেন। হা হা হা কিংবা খিলখিল করে হেসে উঠতে হয়। চেপে রাখার সুযোগ নেই। বাছাইকৃত মজাদার ও রসাত্মক ফেসবুক স্ট্যাটাস নিয়ে বইটি। খ্যাতিমান মানুষ থেকে সাধারণের মধ্যে যে রসবোধ প্রখর, প্রমাণ মিলবে এতে।
পাঠককে নিষ্কলুষ হাসি উপহার দেওয়ার প্রচেষ্টায় মেতেছেন শফিক হাসান। উদ্যোগ সার্থক নাকি অন্যকিছু সেই চিত্রই ফুটে উঠেছে বইয়ের পাতায় পাতায়।
Facebook Rongo Rosikota - Collection & edited by Shafique Hasan
কুনাফার শহরে – ক্ষমা মাহমুদ
ভ্রমণকাহিনি কেবল কোনো জায়গার প্রকৃতি বা রূপ বর্ণনাই নয়, তার সঙ্গে অনুপান হিসেবে থাকতে হয় জায়গাটার ইতিহাস-ঐতিহ্য, মানুষ এবং তাদের জীবনযাপনের সুলুক-সন্ধানও। তবে তথ্য বা ইতিহাসের অনুপাত কতখানি হবে, তারও রয়েছে কিছু অলিখিত হিসাব। তথ্য-উপাত্ত এবং সাহিত্যরসের ভারসাম্য রক্ষা করে একটা উপাদেয় ভ্রমণবৃত্তান্ত উপস্থাপন করার ক্ষমতা একজন কুশলী ভ্রমণলেখকের বিরল গুণ। এই বইতে এসব উপাদান ও রসে জারিত সাতটি ভ্রমণগল্প পাঠককে নিয়ে যাবে জর্ডানের ইতিহাসের অলিগলিতে যেখানে থমকে আছে হাজার বছর আগের সময়, যার পরতে পরতে পাওয়া যাবে নানান জানা-অজানা তথ্য।
গ্রেকো-রোমান সময়ে জর্ডানের রাজধানী আম্মানের নাম ছিল ফিলাডেলফিয়া, আরব দেশ হলেও জর্ডানে যে একসময় গ্রিক রোমানদের জবরদস্ত উপস্থিতি ছিল-সেসব নিদর্শনের সুস্বাদু বর্ণনা ও ইতিহাস পাওয়া যাবে এই বইতে। নরম হলুদ গমের মতো মিঠে রোদমাখা আরাম পাওয়া যাবে ওয়াদিরাম মরুভূমিতে যাযাবর বেদুইনদের ঘরবাড়ি আর জীবনযাত্রার অনুপুঙ্খ বর্ণনায়। আবার পাওয়া যাবে একই মরুভূমিতে তাঁবুর ভেতর রাতের তারা দেখে রাত কাটানোর বিরল অভিজ্ঞতাও। প্রাচীন রূপকথার মতো অবিশ্বাস্য সুন্দর পাথুরে নগরী পেত্রার ভেতর ফারাও রাজাদের ধন ভান্ডারের দরজাও যেন খুলে যাবে বর্ণনার মুনশীয়ানায়। জর্ডানের মৃত সাগরের জীবন্ত বর্ণনার সঙ্গে এই সাগরটি সম্পর্কে বহু মিথ ভেঙে দিয়ে প্রকৃত তথ্য তুলে ধরার পাশাপাশি বর্তমান যুগের বাণিজ্য-আগ্রাসনে এই বিচিত্র সাগর যে ক্রমে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, সেটা নিয়ে লেখকের উদ্বেগের আভাসও পাওয়া যাবে এই বইতে।
Kunafar Shahore - Khama Mahmud
দেখি বাংলার মুখ – শফিক হাসান
শফিক হাসানের দেখা বাংলার মুখ আদতে কেমন!
‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া’
তারপরের কথা—‘একটি ধানের শিষের উপরে একটি শিশির বিন্দু’।
মনে এই খেদ যেন না থাকে, শফিক হাসান বেরিয়ে পড়েছেন বাংলাদেশের নানা জায়গা প্রাণভরে দেখতে। তার বর্ণনা রম্য, সহাস্য আনন্দময় ও প্রাঞ্জল। নানা সব জায়গার ভেতরে—লালনের স্মৃতিভরা স্থান, কেওক্রাডং চূড়া, মুজিবনগর, কক্সবাজার, চট্টগ্রামের নানা জায়গা, সমুদ্র ও পর্বত, রেলযাত্রায় তূর্ণা নিশিথায় নিশিযাপন এবং জলজোছনায় ভেসে যাওয়া হাতিরঝিল—এমনি মায়াময়, সুরভিময় নানা স্থানে। আমরা যখন ফট করে বাইরে ঘুরতে যাই কখনো কি ভাবি দেশের কতটুকু দেখেছি।
না, শফিক হাসান তেমন কোনো খেদ করবেন না যেদিন বিশ্বভ্রমণে বেরিয়ে পড়বেন। ‘দেখি বাংলার মুখ’ এমনই একটি গ্রন্থ। সবকিছু দেখার আগে নিজেদের দেখো। অপূর্ব। সুন্দর ঝরঝরে গদ্যে দেখার সেইসব বর্ণনা আমাদের দেশটাকে নতুন করে চেনাবে। আমি এই গ্রন্থের বহুল প্রচার কামনা করি।
সালেহা চৌধুরী
ঢাকা
মার্চ, ২০২৪
Dekhi Banglar Mukh by Shafique Hasan
সুপ্রিয় দিনলিপি ( দ্বিতীয় খণ্ড)
ভূমিকা
মূলত: ‘সুপ্রিয় দিনলিপি’ শিরোনামে আমার এই লেখাগুলো যে শুধুমাত্র দৈনন্দিন জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, লেখাগুলো যে আসলেই মান-সম্পন্ন, পরিশীলিত এবং এতে যে সামগ্রিকভাবে একটি স্পষ্ট বক্তব্য বা ম্যাসেজ বিদ্যমান থাকে এবং তা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকাতেও প্রকাশিতও হচ্ছে- এই সামগ্রিক ব্যাপারটি আমি উপলব্ধি করতে পেরেছি বহু বছর পরে, ১৯৯৮ সালের দিকে যখন ‘দৈনিক ভোরের কাগজ’ এ আমার প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়। তখন আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এর বিবিএ (অনার্স) এর শিক্ষার্থী। এরপর জীবনের বিভিন্ন সময়ে সাহিত্য, ছোট-গল্প, বিভিন্ন ন্যাশনাল ইস্যু, উপন্যাসের সমালোচনা, বঙ্গবন্ধুর জীবনী, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন বিষয়াবলীর ওপর আমার আর্টিক্যাল ও কলামগুলো একে একে দৈনিক প্রথম আলো, দৈনিক ভোরের কাগজ, দৈনিক আজাদী ইত্যাদি জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হতে থাকে। দ্যাট মীনস্ সিরিয়াসলি কাউন্ট করলে আমার লেখালেখির বয়স হচ্ছে বিশ (২০) বছর। কিন্তু যেহেতু আমি প্রফেশনাল রাইটার নই, তাই আমার লেখাগুলো প্রকাশিত হয় অনিয়মিতভাবে এবং সংখ্যায় খুবই কম। ‘সুপ্রিয় দিনলিপি’ শিরোনামে এখনো আমি ক্লান্তিহীনভাবে লিখে যাচ্ছি। এই পর্যন্ত আমার সেইসব লেখা সর্বমোট ১৯টি ডায়রীতে এসে দাঁড়িয়েছে। সেখান থেকে বাছাইকৃত কিছু লেখার ‘পরিবর্ধন -পরিমার্জিত’ রূপ নিয়েই রচিত ‘সুপ্রিয় দিনলিপি (দ্বিতীয় খণ্ড)’ পাঠকদের সঙ্গে শেয়ার করার নিমিত্তে। গ্রন্থটিকে রূপক অর্থে মূলতঃ ‘একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ’ও বলা যায়। এই গ্রন্থটিতে প্রধানত যে সময়কালের ঘটনাবলী বিশ্লেষনাত্মকভাবে তুলে ধরা হয়েছে, সেই সময়কাল হচ্ছে- ২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল। অদূর ভবিষ্যতে ক্রমান্বয়ে ‘সুপ্রিয় দিনলিপি’ এর- তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ এবং সপ্তম খণ্ডে পরবর্তী সময়কালের ঘটনাবলী বিশ্লেষণাত্মকভাবে তুলে ধরা হবে এবং একটা পর্যায়ে এর ইংলিশ ভার্সনও বের করা হবে- এইরকম একটি প্লান আমার রয়েছে।
আমি মনে করি,
“সময়ের সাথে সাথে নিজের মন ও মেধাকে আপডেটেড রেখে ধর্মীয় কুসংস্কার, বিজাতীয় সংস্কৃতির আধিপত্য ও দৌরাত্ম্য, রাজনৈতিক অস্থিরতা, পারস্পারিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত, মেধার অবমূল্যায়ন, শিক্ষা-ব্যবস্থার ভগ্নদশা, শিক্ষকদের অবমূল্যায়নসহ সামাজিক আরও নানা অসঙ্গতি, দুর্নীতি পরিহার করে বাংলাদেশের যে নিজস্ব একটি আদর্শ, ঐতিহ্য, ইতিহাস, কৃষ্টি-কালচার, সামাজিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় মূল্যবোধ, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, রাজনৈতিক মূল্যবোধ রয়েছে- সামগ্রিকভাবে তার অনুশীলন করা- বাঙ্গালী জাতি হিসেবে আমাদের সকলের দায়িত্ব ও কর্তব্য। ১৯৭১ সালে সবাই সময়ের প্রয়োজনে যুদ্ধ করেছিল, তখন যুদ্ধ করে দেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে ‘স্বাধীন’ করাই ছিলো তখনকার সময়ের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন। আর এখন আকাশ-সংস্কৃতির এই আগ্রাসনের যুগে অর্থাৎ এই সময়ের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন হচ্ছেÑ ‘আলোকিত এবং একই সঙ্গে মানবিক, দেশপ্রেমিক, নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্ন , অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, আধুনিক মানুষ ও চাই, যাতে করে একটি উন্নত ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণের লক্ষ্যেÑ আমরা বাংলাদেশের সকল মানুষ একসঙ্গে কাজ করতে পারি ঠিক সেই মুক্তিযুদ্ধের মতো।
অর্থাৎ বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে একটি আত্মনির্ভরশীল, সংস্কারমুক্ত, স্বশিক্ষিত, মেধাবী, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরতে হলে- আমাদের সকলকে আরেকটি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে হবে এবং যেখানে আমাদের মূল অস্ত্র হবেÑ আমাদের কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভাষা ও অন্যান্য সকল জাতীয় অর্জন এবং একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধের বহিঃপ্রকাশ! ‘আলোকিত মানুষ চাই এবং একই সঙ্গে মানবিক, দেশপ্রেমিক, নৈতিকমূল্যবোধসম্পন্ন, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, আধুনিক মানুষও চাই’- মূলত এটাই হওয়া উচিত আধুনিক বাংলাদেশ এর শ্লোগান’।
রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘পৃথিবীর উপকার করতে চাইলেও করা যায় না, তার চেয়ে বরং আমরা যা করতে পারি তাই যদি করি তাহলে আপনা-আপনি পৃথিবীর উপকার হয়ে যায়’।
মূলত: পাঠকের ভালো লাগা এবং ভালোবাসাই হচ্ছে লেখকের প্রত্যাশা পূরণ। আশা করি, আপনারা কখনো আমাকে এবং আমার লেখাকে সেই ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করবেন না। আমি মূলত প্রফেশনাল রাইটার নই। আমার মূল পেশা ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করা’ আর নেশাÑ ‘লেখালেখি করা’। ‘পেশা’য় জড়িত না থাকলে আমার এ পৃথিবীতে জীবন-ধারণ ও অস্তিত্ব রক্ষাই দুরূহ হয়ে উঠবে কিন্তু ‘নেশা’টা আমার মাঝে-মধ্যে করলেও চলবে। ‘শিক্ষকতা’ পেশায় ব্যস্ত থাকার কারণে, এই গ্রন্থটির প্রতি হয়তবা পরিপূর্ণ মনোনিবেশ ঘটাতে পারিনি। ‘সুপ্রিয় দিনলিপি (প্রথম খণ্ড) অথবা সুপ্রিয় দিনলিপি (দ্বিতীয় খণ্ড)’ এর কোথাও যদি পাঠকেরা অতৃপ্তি কিংবা অসম্পূর্ণ ফিল করেন, তাহলে তাদের কাছে অনুরোধ- ‘আপনারা রেগুলারলি ‘সুপ্রিয় দিনলিপি’-এর পরবর্তী খণ্ডগুলো সংগ্রহ করবেন’। আশা করি, তাহলে আর কোনো অতৃপ্তিবোধ থাকবে না। উল্লেখ্য, সুপ্রিয় দিনলিপি (দ্বিতীয় খণ্ড) -এর পাঠকগণ ‘অনুপ্রাণন প্রকাশন’ থেকেই ‘সুপ্রিয় দিনলিপি (প্রথম খণ্ড)’-বইটি সংগ্রহ করতে পারবেন।
‘সুপ্রিয় দিনলিপি’ গ্রন্থটি প্রকাশের ব্যাপারে আমাকে বাংলাদেশের যে দু’জন স্বনামধন্য সাংবাদিক সবসময় সহযোগীতা ও উৎসাহ যুগিয়েছেন, তারা হচ্ছেনÑ ১. সাংবাদিক ‘সালিম সামাদ’ (বাংলাদেশের একজন স্বনামধন্য সাংবাদিক) যিনি ‘দি ডেইলী আওয়ার টাইমস্’ সহ আরও বেশ কয়েকটি সংবাদপত্রে এ কাজ করছেন এবং তিনি ২০০৫ সালে প্রেসটিজিয়াস ঐবষষসধহ-ঐধসসবঃঃ অধিৎফ অর্জন করেন এবং একসময় ‘ইন্ডিয়া টু ডে’, ‘বাংলাদেশ অবজাভার’, ‘বিবিসি’সহ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ঈড়ৎৎবংঢ়ড়হফবহঃ ধহফ জবঢ়ড়ৎঃবৎ হিসেবে কাজ করেছেন এবং ২. সাংবাদিক ‘রাশেদ রউফ’ যিনি বর্তমানে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় দৈনিক ‘দৈনিক আজাদী’র সহযোগী-সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিক হিসেবে কর্মরত। তিনি একই সঙ্গে বাংলাদেশের একজন স্বনামধন্য শিশু-সাহিত্যিক এবং কবি। তিনি ২০১৬ সালে ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার’ লাভ করেন।
এ গ্রন্থটির প্রচ্ছদ নির্বাচন করেছেনÑ সাংবাদিক, কবি ও শিশু সাহিত্যিক ‘রাশেদ রউফ’ এবং গ্রন্থটি প্রকাশনা করেছেন ‘অনুপ্রাণন প্রকাশন’। হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে কৃতজ্ঞচিত্তে সাংবাদিক ‘সালিম সামাদ’, ‘রাশেদ রউফ’ এবং ‘অনুপ্রাণন প্রকাশন’ এর কর্ণধারসহ সকল কলাকুশলীদের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
ফারহানা আকতার
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ
১৫ জানুয়ারি ২০২০
Suprio Dinlipi, Part-2


















































































































































































































































































































































